বৃহস্পতিবার, ২২ অগাস্ট ২০১৯, ০৬:৫৯ পূর্বাহ্ন

অগ্নিপরীক্ষায় যুবরাজের ধরপাকড়ে আটকদের স্বজনরা

অগ্নিপরীক্ষায় যুবরাজের ধরপাকড়ে আটকদের স্বজনরা

সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান।

নিউজটি শেয়ার করুন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:মাস কয়েকের জন্য কারাগারে নেয়া হয়েছিল তার ভাইকে। এর পর আর তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না। তার তকদিরে কী ঘটেছে, তা নিয়ে সৌদি কর্মকর্তারা বিস্ময়করভাবে নীরব। কারাগারে তিনি অকথ্য নির্যাতিত হচ্ছেন বলেও খবর শোনা যাচ্ছিল। কাজেই সৌদি নারী আরিজা আল সাধান শেষ আশ্রয়টিই বেছে নিলেন। যদিও তা কঠিন যন্ত্রণার ও ঝুঁকিপূর্ণ।

তিনি প্রকাশ্য প্রতিবাদে চলে এলেন। বিদেশি গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেয়া এবং অনলাইনে আবেদন জানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। এতে কিছুটা হলেও চাপে পড়ে তার ভাইয়ের বর্তমান অবস্থা সৌদি সরকার প্রকাশ করবে বলে তিনি আশা করেন।-খবর ওয়াশিংটন পোস্টের

বছরখানেক আগে ৩৫ বছর বয়সী আবদুর রহমান আল সাধান আটক হন। তিনি একজন সাহায্যকর্মী। বোন যখন তার খবর জানতে প্রকাশ্যে আসার সিদ্ধান্ত নেন, সৌদি সরকার তখন তাকে প্রবলভাবে নিরুৎসাহিত করে। তার আশঙ্কা, এতে সে কিংবা তার ভাই সরকারের প্রতিহিংসার শিকার হতে পারেন।

এর পর অনলাইনে এলে সৌদি সরকার সমর্থকদের কাছ থেকে মুষলধারে গালাগালি শুরু করে। ক্যালিফোর্নিয়া থেকে টেলিফোনে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সম্ভাব্য সব উপায়ে আমি চেষ্টা করেছি। মনে হচ্ছে, মুখের সামনে সব দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

এ ঘটনা কেবল তার একার ক্ষেত্রেই নয়। গত বছর আরও অনেকের স্বজনকে ধরে নিয়ে গেছে সৌদি আরব। তাদের দীর্ঘমেয়াদে আটকে রাখা হয়েছে। এমনকি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো অভিযোগ দাখিলও করা হয়নি তাদের বিরুদ্ধে। এতে তাদের নিকটজনদের ধৈর্যচ্যুতি ঘটে যাওয়াই স্বাভাবিক।

এতে এসব ঘটনা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলার মতো অস্বাভাবিক ও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে তাদের। এর মাধমে রাজপরিবারের দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা নীতিকে অবজ্ঞা করতে হচ্ছে তাদের। গোপনীয় সুরক্ষার ব্যাপারেই সৌদি রাজপরিবারের ঝোঁক বেশি। সে ক্ষেত্রে প্রকাশ্য নিন্দার বদলে ব্যক্তিগত অনুরোধে তারা ভালো জবাব দেন বলে একটা প্রচলন আছে।

আটক ব্যক্তিদের বেশ কয়েকজন স্বজন বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে আবডালে বহু চেষ্টার পর ব্যর্থ হয়ে তারা প্রকাশ্যে চলে এসেছেন।

সমালোচকরা বলেন, সৌদি সিংহাসনের উত্তরসূরি মোহাম্মদ বিন সালমানের ব্যাপক পরিবর্তনের ফল হিসেবে তাদের এ ক্রমাগত হতাশা। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে দেশটিতে অনেক বেশি কর্তৃত্ববাদ কায়েম করেছেন তিনি। যদিও বেশ কিছু সামাজিক বিধিনিষেধ শিথিল করে তারিফও কুড়িয়েছেন।

মোহাম্মদ বিন সালমানের প্রভাব বিস্তারের প্রতিফলন হচ্ছে পরিবারগুলোর এই দুর্দশা ও হতাশা। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে যেটার পরিসর বেড়েই চলেছে। এর পর থেকে ভিন্নমত কিংবা খ্যাতির কারণে লোকজনকে আটক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। কখনও কখনও কী কারণে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তা পরিবার ও সাধারণ মানুষের কাছে রহস্যই রয়ে গেছে।

স্বজনরা বলছেন, দেশটির নেতৃবৃন্দের সিদ্ধান্ত নিয়ে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী করাও যায় না। সে ক্ষেত্রে নীরব থাকাটা আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে।

কেউ কেউ বলছেন, গত বছরের অক্টোবরে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রকাশ্যে কথা বলার সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করেছে। খাশোগি হত্যাকে সরকারের সমালোচকদের ওপর অচিন্তনীয় নৃশংসতা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

সৌদি কর্তৃপক্ষ বলছে, খাশোগিকে দেশে ফিরিয়ে আনতে পাঠানো দলটি সরকারের নির্দেশ অমান্য করে তাকে হত্যা করেছে। তাদের কয়েকজন এখন বিচারাধীন।

বেশ কয়েকজন স্বজন বলেন, তাদের পরিবার অতীতে রাজনীতি থেকে বহু দূরত্ব বজায় রেখেছে এবং সৌদি আইন প্রয়োগকারী বাহিনীর মনোযোগ আকর্ষণের বিষয়টি কখনও খেয়াল করেনি তারা। বাকিরা মানবাধিকার নিয়ে সক্রিয় পরিবার সদস্যদের মুক্তির জন্য প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানিয়েছেন।

বিশ্লেষকরা বলেন, সৌদি যুবরাজের জন্য কিছু কিছু আটক সমাজের কয়েকটি অংশকে বার্তা দেয়ার কার্যকর উপায় হিসেবে কাজ দিয়েছে। অর্থাৎ সামাজিক বিভিন্ন বিষয়আশয় নিয়ে সম্ভাব্য তৎপরতা প্রদর্শনকারীদের নিরুৎসাহিত করা হয়েছে এই আটক অভিযান। বেশ কিছু সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ধর্মীয় রক্ষণশীলদের দমিয়ে রাখতে সতর্ক বাণীও হতে পারে এসব।

কিন্তু ধরপাকড়ের বর্তমান মাত্রায় সৌদি নেতৃত্বের মাথায় নতুন করে ব্যথা শুরু হয়েছে।

ছোট হলেও স্বজনদের একটি ক্রমবর্ধমান দল গ্রেফতার অভিযান নিয়ে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। সরকার তাদের মুখ বন্ধ রাখাকেই বেশি পছন্দ করছে। আর এটা করতে সৌদি আরবের ভয়নক চেহারাটা তারা মেলে ধরছেন।

আবদুর রহমান আল সাধানসহ বেশ কয়েকজন আটককে নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সৌদি সরকারের কাছ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।

সাক্ষাৎকার দেয়া সব স্বজন বলছেন, সৌদি আরবের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক বজায় থাকবে বলে তারা আশা করছেন। যদিও সবকিছু নিয়ে তারা জনসমক্ষে কথা বলেছেন। তাদের মধ্যে কেউ এখনও সৌদি কর্তৃপক্ষের কোনো প্রতিহিংসার শিকার হওয়ার কথা এখনও বলেননি। কিন্তু আরিজ আল সাধানের মতো অনেকেই তাদের স্বজনদের ওপর সরকার কেমন আচরণ করছেন, তা বলতে পারছেন না। তাদের জানতে দেয়া হচ্ছে না।

নারী অধিকারকর্মী লাজিন আল হাজলাওলের আটক নিয়ে যখন তার ভাইবোনেরা প্রকাশ্যে কথা বলেন এবং তার ওপর নির্যাতন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন, বিদেশে সৌদি আরবের ভাবমর্যাদা নষ্ট করার অভিযোগ তুলে তখন তাদের তুলাধোনা শুরু হয়।

গত মার্চে নিজের টুইটারে এক পোস্টে লাজিনের বোন আলিয়া আল হাজলাওল বলেন, গণমাধ্যমে সাক্ষাতকার দেয়ার আগে এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমরা কথা বলেছি। কিন্তু কোনো সাড়া পাইনি।

কারাগারে নির্যাতন নিয়ে তারা মিথ্যা ছড়াচ্ছেন বলে এক সৌদি সাংবাদিকের অভিযোগের জবাবে তিনি এসব কথা লিখেছেন। এক ধরনের সুক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রেখে আলিয়া বলেন, নির্যাতনের ঘটনা কোনো জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় না বলে তা তুচ্ছ করে দেখা হচ্ছে।

কথা বলার সময় সরকারের সমালোচনা না করে যুক্তি দেখান যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের নিজেদের আইন লঙ্ঘন করে নির্যাতন করছেন। কিন্তু আটকদের নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করছে সৌদি কর্তৃপক্ষ।

আটকের প্রতিবাদ করতে গিয়ে স্বজনদের অ্যাডভোকেট হিসেবে এক অপরিচিত ভূমিকা পালন করছেন তারা। অর্থাৎ এমন ভূমিকা কিংবা তৎপরতার কথা তারা কখনোও কল্পনাও করেননি। ব্রাসেলসে বসবাসরত এ দুই সন্তানের মা একটি জ্বালানি কোম্পানিতে কাজ করছেন। আর আরিজা একটি প্রযুক্তি কোম্পানিতে চাকরি করেন।

তিনি বলেন, আমি কখনই একজন অধিকারকর্মী ছিলাম না।

এক দশক আগে তিনি সৌদি ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান, তখন নারীদের গাড়ি চালানো অধিকারের সমর্থক ছিলেন। আরিজা বলেন, কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়ায় সৌদি রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামানো বন্ধ করে দিলাম। সেখানে আমার মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়ে বেশি মনোযোগ ছিল। কিন্তু এখন দেশটিতে কী ঘটেছে, কী পরিবর্তন এসেছে, সেদিকেই বেশি মনোনিবেশ করেছি।

উপকূলীয় শহর জেদ্দায় ছিলেন ২৬ বছর বয়সী আহমাদ আল ফাতাহি। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তার বাবাকে গ্রেফতার করলে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি চিন্তায় পড়ে যান তিনি। ২০১৭ সালের নভেম্বরে তার বাবা সৌদি ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ নাগরিক ওয়ালিদ ফাতিহি একটি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন।

রাজধানী রিয়াদের বিলাসবহুল রিটস-কার্লটন হোটেলে যখন শত শত ব্যবসায়িক নির্বাহী, সরকারি কর্মকর্তা, রাজপরিবারের সদস্যকে বন্দি রাখা হয়েছিল, তখন তার বাবাও তাদের মধ্যে ছিলেন।

ফাতাহি বলেন, বাবাকে মুক্ত করতে আমরা সরকারের কাছে অনেক অনুনয় করেছি, সম্ভাবব্য সব ধরনের মাধ্যম ব্যবহার করেছি। যাতে বাড়াবাড়ি না হয়ে যায়, সে জন্য ব্যক্তিগতভাবে সবকিছু করেছি।

‘কিন্তু আইনজীবী পর্যন্ত তার বাবার সঙ্গে দেখা করতে পারছেন না। তার বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়নি। গত বছর শুনতে পেলাম, বাবাকে নির্যাতন করা হচ্ছে। কাজেই অনিচ্ছা সত্ত্বেও গণমাধ্যমের কাছে সব বলতে বাধ্য হয়েছি।’

অবশেষে তিনি বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিতে, মার্কিন কংগ্রেস সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং ক্যাপিটল হিলে সাক্ষ্য দিতে রাজি হয়েছেন। ফাতাহি বলেন, আমার সৌদি বন্ধু ও স্বজনরা বারবার নিষেধ করেছেন, যাতে বেশি দূর না এগোই। তারা সবাই সন্ত্রস্ত। ‘আমি কোনো অনুমতি বা সম্মতির অপেক্ষা করিনি। এসব করতে আমার ভালো লাগেনি। বাবার মুক্তি ও পরিবারকে পুর্নমিলিত করতেই সব করেছি।’

স্বজনদের মুক্তির জন্য যেসব পরিবার গণমাধ্যমসহ জনসমক্ষে কথা বলেছেন, তা যে কোনো কার্যকর কৌশল, এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু তাদের এ চেষ্টা সৌদি নেতৃবৃন্দের ওপর সামান্য হলেও চাপ ফেলতে পেরেছে।

ট্রাম্প প্রশাসন বেশ কয়েকাবার বলেছে, সৌদি সরকারের কাছে তারা ওয়ালিদ ফাতাহির আটকের বিষয়টি তুলে ধরেছেন। এ ছাড়া আটকদের স্বজনদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে নারী অধিকারকর্মী ও অন্যান্য আটক ভিন্নমতাবলম্বী হয়ে কাজ করতে হোয়াইট হাউসকে তাগিদ দিয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *







© All rights reserved © 2017 Nonditosylhet24.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ