বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ০২:০৫ পূর্বাহ্ন

আঞ্চলিক অর্থনীতির কেন্দ্র হতে পারে বাংলাদেশ

আঞ্চলিক অর্থনীতির কেন্দ্র হতে পারে বাংলাদেশ

নিউজটি শেয়ার করুন

নন্দিত ডেস্ক:ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশের দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির কেন্দ্র হয়ে ওঠার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ভারতের নয়াদিল্লিতে বৃহস্পতিবার দুপুরে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামে (ডব্লিউইএফ) দেয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, আমরা এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক হাব হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারি। আমাদের নিজস্ব ১৬ কোটি জনগণ ছাড়াও প্রায় ৩০০ কোটি মানুষের একটি বিশাল বাজারের যোগাযোগের পথ হতে পারে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারী বিশেষ করে, ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশের শিক্ষা, হালকা প্রকৌশল শিল্প, ইলেকট্রনিক্স শিল্প, অটোমোটিভ শিল্প, কৃত্রিম বৃদ্ধিমত্তা শিল্পের মতো ক্ষেত্রগুলোয় বিনিয়োগ করার সময়।

বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক স্থান হিসেবে নজরকাড়ার মতো যোগ্যতা অর্জন করেছে মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পূর্ব এশিয়া, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, পশ্চিমে চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যবর্তী হওয়ায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক এবং ভারতের ব্যবসার অন্যতম ক্ষেত্র হতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি স্বাধীন ও উদার বিনিয়োগের পরিবেশ বিরাজ করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিনিয়োগবান্ধব বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের জন্য আইনি সুরক্ষা, উদার রাজস্ব ব্যবস্থা, মেশিনপত্র আমদানির ক্ষেত্রে বিশেষ ছাড়, আনরেস্ট্রিকটেড এক্সিট পলিসি, সম্পূর্ণ বিনিয়োগ ও পুঁজি নিয়ে চলে যাওয়ার সুবিধাসহ নানাবিধ সুবিধা রয়েছে।

সব সুবিধাসহ ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর মধ্যে ১২টি অঞ্চল এরই মধ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছে। দুটি অঞ্চল ভারতের বিনিয়োগকারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনী প্রতিষ্ঠানের জন্য বেশ কয়েকটি হাইটেক পার্ক প্রস্তুত করা হয়েছে।

গত বছরের এইচএসবিসির পূর্বাভাসের উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে ২৬তম সর্ববৃহৎ অর্থনীতি হবে। দুটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ, এর একটি হচ্ছে- আমাদের উন্মুক্ত সমাজ, ধর্মীয় সম্প্রীতি, উদার মূল্যবোধ, ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতি।

অপরটি হল- আমাদের জনগোষ্ঠীর দুই-তৃতীয়াংশ তরুণ। এদের বেশির ভাগের বয়স ২৫ বছরের নিচে। তারা দক্ষতা অর্জন করছে, তারা প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন, তারা প্রতিযোগিতামূলক কাজে যুক্ত হতে প্রস্তুত।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২১ সালের মধ্যে একটি উন্নয়নশীল দেশ, ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে বঙ্গবন্ধুর অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে। বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশের অগ্রগতি উল্লেখ করে তিনি বলেন, অন্য অনেক দেশের মতো আমরাও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করছি, তবে আমাদের জানা আছে কীভাবে এই চ্যালেঞ্জ সুবিধায় রূপান্তরিত করতে হয়।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বছর আমাদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সর্বোচ্চ ৮ দশমিক ১ শতাংশের রেকর্ড করেছে। আমরা দুই ডিজিট প্রবৃদ্ধি অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছে গেছি। বাংলাদেশের অর্থনীতি ২০০৯ সালের পর থেকে ১৮৮ শতাংশ বেড়েছে। আমাদের মাথাপিছু আয় হয়েছে প্রায় ২০০০ মার্কিন ডলার।

বাংলাদেশকে একটি দ্রুতবর্ধনশীল দেশ হিসেবে উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমরা গত বছর কোরিয়ায় ১২টি শিল্প রোবট রফতানি করেছি। বাংলাদেশে তৈরি চারটি জাহাজ ভারতে আসছে। তিনি বলেন, ভারতের রিলায়েন্স কোম্পানি সম্প্রতি বাংলাদেশে তৈরি বিপুলসংখ্যক রেফ্রিজারেটর আমদানি করেছে। বাংলাদেশে ৬ লাখ আইটি ফ্রিল্যান্সার রয়েছে। সর্বাধিক সংখ্যক লোক ফ্রিল্যান্সিং করছে।

বাংলাদেশের কৃষি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের কৃষি এখন পুরোপুরি স্বাবলম্বী। বিশ্বে চাল উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন চতুর্থ বৃহৎ দেশ, পাটে দ্বিতীয়, আমে চতুর্থ, শাকসবজি উৎপাদনে পঞ্চম এবং অভ্যন্তরীণ মাছচাষে চতুর্থ। আমরা প্রধান শস্য ও ফলের জিন কোড করছি এবং এ ব্যাপারে অগ্রসর হচ্ছি।

তিনি বলেন, ২০০৯ সালের পর দেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তর করেছি। তৃণমূল পর্যায়ে শতভাগ লোক আইসিটি সুবিধা পাচ্ছে। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে পঞ্চম সর্ববৃহৎ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী দেশ। আমরা দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা ক্যাশলেস সোসাইটির দেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। বাংলাদেশ দ্রুত নগরায়ণ হচ্ছে। আমাদের জনগোষ্ঠীর ৪০ শতাংশ শহরে বাস করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, ২০২৫ সালের মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট সুবিধা ৪০ শতাংশ মানুষের কাছে পৌঁছে যাবে।

ডব্লিউইএফের প্রেসিডেন্ট বোর্জ ব্রান্ডসহ সংস্থার নেতারা বাংলাদেশের অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। তারা দেশের অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জনে নেতৃত্বের রোল মডেল হিসেবে বর্ণনা করেন।

বাংলাদেশের ব্যাপক উন্নয়নের জন্য সামাজিক মূল্যবোধ ও দেশের মানুষের আস্থার প্রশংসা করে শেখ হাসিনা বলেন, অনেকেই বাংলাদেশকে ‘৩ কোটি মধ্য ও উচ্চবিত্ত মানুষের একটি বাজার’ এবং ‘অলৌকিক উন্নয়নের দেশ’ হিসেবে দেখে থাকেন।

তিনি বলেন, আমি মনে করি, আমাদের প্রধান শক্তি হচ্ছে সামাজিক মূল্যবোধ ও বাংলাদেশের প্রতি মানুষের আস্থা। সাম্যতা, সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলার আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি আমাদের নেতৃত্বের প্রতি তাদের আস্থা।

প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান সেমিনারে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশে একটি পরিবেশবান্ধব সরকার রয়েছে।

৪০টি দেশের ৮০০ প্রতিনিধি দু’দিনের এই সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন। আজ সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনেও বক্তব্য দেবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী বৃহস্পতিবার তার সম্মানে বাংলাদেশ হাইকমিশনের মৈত্রী হল এবং বাংলাদেশ হাউসে আয়োজিত অভ্যর্থনা ও নৈশভোজে যোগ দেন। ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এ নৈশভোজের আয়োজন করে।

টানা তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর শেখ হাসিনা তার প্রথম ভারত সফরে ৫ অক্টোবর নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করবেন। তিনি একই দিন ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সভাপতি সোনিয়া গান্ধী ৬ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।

এদিকে আজ প্রধানমন্ত্রী তিয়ানে আইসিটি মোরিয়ায় ভারতীয় আইসিটি প্রতিষ্ঠানের সিইওদের সঙ্গে মতবিনিময় অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। এছাড়া তিনি আইসিটি মোরিয়ার কমল মহলে ইন্ডিয়া-বাংলাদেশ বিজনেস ফোরামের (আইবিবিএফ) উদ্বোধনী অনুষ্ঠান এবং হোটেল তাজ প্যালেসের দরবার হলে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সমাপনী অধিবেশনে যোগ দেবেন। সিঙ্গাপুরের উপপ্রধানমন্ত্রী হেং সুই কিয়েট বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন।

একই দিন কয়েকটি এক্সচেঞ্জ অব অ্যাগ্রিমেন্ট ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে এবং ঐতিহাসিক হায়দরাবাদ হাউস থেকে দু’দেশের প্রধানমন্ত্রী যৌথভাবে কয়েকটি প্রকল্প উদ্বোধন করবেন। এদিন এর আগে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শঙ্কর বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। শেখ হাসিনা এদিন আনুষ্ঠানিক মধ্যাহ্নভোজে যোগ দেবেন এবং হায়দরাবাদ হাউসে দর্শনার্থী বইয়ে স্বাক্ষর করবেন।

সফরকালে ভারতের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক শ্যাম বেনেগাল প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করবেন। তাকে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে একটি চলচ্চিত্র তৈরির দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে যোগ দিতে চারদিনের সরকারি সফরে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে দিল্লির পালাম এয়ারফোর্স বিমানঘাঁটিতে পৌঁছান। সেখানে তাকে লাল গালিচা অভ্যর্থনা জানানো হয়। ভারতের নারী ও শিশুকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী দেবশ্রী চৌধুরী, ভারতে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী এবং বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলী বিমানবন্দরে ফুলের তোড়া দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান। বিমানবন্দর থেকে প্রধানমন্ত্রীকে মোটর শোভাযাত্রা সহকারে হোটেল তাজমহলে নিয়ে যাওয়া হয়।

এর আগে বাংলাদেশ বিমানের একটি ভিভিআইপি ফ্লাইট প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের নিয়ে সকাল সোয়া ৮টায় ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ত্যাগ করে। এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে বিদায় জানাতে উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, চিফ হুইপ নূর-ই-আলম চৌধুরী লিটন, বেসামরিক বিমান ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী মাহবুব আলী, মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং তিন বাহিনীর প্রধান। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৬ অক্টোবর দেশে ফিরবেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *







© All rights reserved © 2017 Nonditosylhet24.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ