শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ০২:৩৫ পূর্বাহ্ন

একটি বিভীষিকাময় রজনী ও সিলেটের চিকিৎসা ব্যবস্থা

একটি বিভীষিকাময় রজনী ও সিলেটের চিকিৎসা ব্যবস্থা

নিউজটি শেয়ার করুন

খালেদ আহমদ : ১৭ রমজান বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১ টা। আমার কলিজার টুকরা জিসান আহমদ নাফি হঠাৎ করেই ঘুম থেকে চিৎকার দিয়ে উঠলো। আমরা তখনো সজাগ, ঘুমাইনি। কারণ পরদিন সকালে নাফি’র মায়ের প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা। ছেলেটার চিৎকার শুনে বেশ ভয় পেয়ে গেলাম। নাফি সোনাকে কোলে নিলাম। জানালো তার কানে ব্যাথা করছে। বুঝতে বাকি নেই কানের ব্যাথা আবারো বেড়েছে। তখনো প্রচ- রকম চিৎকার দিয়ে কাঁদছে বাবাটা। ওর মা কোলে নেয়ার চেষ্টা করলেন। সে কারো কোলে যাবেন। বাবা থাকলে আর কাউকে পছন্দ হয়না তার। কাধে করে রুমের মধ্যে হাটাহাটি করছি। কিছুতেই কান্না থামছেনা। এক নাগাড়ে কেঁদেই যাচ্ছে বাবাটা। রাত ৩ টা বেজে গেছে। সেহরী খাওয়ার উপযুক্ত সময়। কোনমতে কোলে নিয়েই খেলাম সেহরী। মা-নানী বারবার নেয়ার চেষ্টা করে ও পারেননি নিতে। সবার সেহরী খাওয়া শেষে নাফিকে নিয়ে আমরা ঘর থেকে বের হয়ে গেলাম। ঘড়ির কাটায় তখন ভোর ৪.৩০ মিনিট। চৌকিদেখী ১ নং গলিতে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে একটি যানবাহনের দেখা পেলামনা। বাধ্য হয়ে আবারো চলে আসি ঘরে। তখন কেঁদেই যাচ্ছে নাফি। কানের ব্যাথা বলে কথা। ছেলেটির কান্না দেখে অঝোরে কাঁদছেন তার মা। আমি তখন লুকিয়ে ফুফিয়ে কাঁদছি। চোখের পানি আটকাতে ও পারছিনা। এ অবস্থায় সকাল ৬ টায় আবারো ঘর থেকে বের হলাম। এবার ভাগ্য যেন কিছুটা সু প্রসন্ন। রাস্তায় গিয়েই পেয়ে গেলাম সিএনজি অটোরিক্সা।
এবার নাফিকে নিয়ে সোজা চলে গেলাম সিলেট উইমেন্স হাসপাতালে। ইমার্জেন্সিতে গিয়ে আমার যেন চোখ কপালে। ইমার্জেন্সি ডাক্তারের রুম তালাবদ্ধ। ঘুমঘুম চোখে বেরিয়ে আসলেন একজন মাসী। বললেন রোজা রমজানের দিন এত ভোরে ডাক্তার কোথায় পাবেন। তাছাড়া আজ শুক্রবার। অসহায়ের মত ফিরে আসলাম সেখান থেকে। চৌহাট্টা পয়েন্টে এসে মনে হল সামনে নুরজাহান হসপিটাল, গিয়ে দেখি কি হয়। ও মা ! গেইটেই ডুকতে দিলনা দারোয়ান। আমার তখন অগ্নিমূর্তি অবস্থা। কি থেকে কি করবো বুঝতেছিনা। অবস্থা আঁচ করতে পেরে তান্নি ( আমার স্ত্রী ) বললেন চল ওসমানী হাসপাতালে যাই। তখন অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে। ওসমানী হাসপাতালে ভাল চিকিৎসা মিলেনা এ রকম একটি নেতিবাচক ধারণা আমার বহুদিনের। তবু ও স্ত্রীর কথায় আর সন্তানের করুণ অবস্থা বিবেচনা করে গেলাম সেখানে। ইমার্জেন্সিতে ১০ টাকার টিকেট কিনে স্বরণাপন্ন হলাম ডিউটি ডাক্তারের। মোচওয়ালা ভদ্র লোক টিকিট হাতে নিয়ে নিচ দিকে তাকিয়েই বলতে লাগলেন, আজ শুক্রবার কোন ডাক্তার তো পাবেননা। আউটডোর ও বন্ধ। ভর্তি হয়ে রেস্টে থাকুন। কাল ডাক্তার আসলে দেখবেন। আমি বিনয়ের সুরে বললাম, দেখুন আমার ছেলেটা ভীষণ অসুস্থ। ওর কানে প্রচ- ব্যাথা করতেছে। আপনি একটু দেখেন, দেখে ওষুধ দিন প্লীজ। আমার ছেলের জরুরী চিকিৎসা দরকার। ভদ্র লোক কোন কর্ণপাত-ই করলেননা। সাফ কথা ভর্তি হলে হন, না হলে চলে যান। তখন একজন ওয়ার্ডবয়কে ডাকলেন তিনি। ইশারায় কি যে বললেন বুঝিনি। তৎক্ষণাত ওয়ার্ডবয় বললো, বের হন- বের হন, রোগী আছে। তখনো আমি ধের্য্যরে চরম পরীক্ষা দিচ্ছি। ব্যাক্তি জীবনে আমি বেশ রগচটা। ধৈর্য্য নেই বললেই চলে। যাকে যা ইচ্ছা বলে ফেলি। অবশ্য পরক্ষণে সেটার জন্য অনুতপ্ত হই, খারাপ লাগে। কিন্তু আজ যেন আমার সমস্ত রাগ সুরমার জলে ভেসে গেছে। নিরুপায় হয়ে ওসমানী থেকে বের হলাম। গেইটের বাইরে এসে ফার্মেসী থেকে একটি নাফা সিরাপ কিনে বাসায় ফিরলাম। গাড়িতে বসে তখন অঝোরে কেঁদেছি। সামনের সীটে বসা ছিলাম। তাই নাফি আমার কান্না দেখেনি। আড়াই বছর বয়সের আমার পাকলুটা ( আদর করে আমি ওকে পাকলু ডাকি ) আমাকে কখনো কাঁদতে দেখলে সে ও কেঁদে দেয়। মনে আছে মাস খানেক পূর্বে প্রচ- জ্বর হলে আমাকে কাঁদতে দেখে সে ও কেঁদেছে। যাক, বাাসায় ফিরে নাফা সিরাপ খাওয়ালাম। তখনো কাঁদছে ময়নাটা। কোলে নিয়ে কিছুক্ষণ হাটলাম। এবার ঘুমালো নাফি। কিছুটা শান্তিবোধ করলাম আমরা। এই ফাঁকে আমার স্ত্রী তার পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কারণ কিছুক্ষণ পরই দক্ষিণ সুরমা সরকারী কলেজে শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা দিতে যাবেন তিনি। বেচারীর বড়ই শখ শিক্ষকতা করার। যেহেতু আগ্রহ আছে তাই আমি ও যতটুকু সম্ভব উৎসাহ দিয়েছি। ঘড়ির কাটায় সকাল নয়টা বাজতেই নাফি’র গুম শেষ। আবার কান্না। ওদিকে পরীক্ষায় যাওয়ার সময়। কিন্তু ছেলেকে এমন পরিস্থিতিতে রেখে তিনি আর পরীক্ষায় যাবেননা বলে জানিয়ে দিলাম। আমি অনুরোধ করলে ও কাজ হয়নি। বললেন, সবার আগে আমার ছেলে। আমি গেলে তুমি ওকে রাখতে পারবেনা ( মা,–শুধুই মা )। যাক অনেক সাধের পরিশ্রমের শিক্ষক নিয়োগে আর অংশ নিতে পারলেননা তিনি।
এবার আসি মূল কথায়। আপনি, আমি , আমরা কিংবা আমাদের সন্তান কখন অসুস্থ হবে আমরা কি বলতে পারবো ? এ জন্যই তো জরুরী চিচিৎসা। আর সে জরূরী চিকিৎসা যদি আমাদের কাজে না আসে তবে কেমন দেশে বাস করছি আমরা? আমার সিলেট, আমার দেশ। এ দেশে, এ শহরে অন্তত আপনার আমার চিকিৎসা ব্যবস্থাটা নিশ্চিত করা হোক। না কি আমার নাফি’র মতো আপনার সন্তান ও ফিরে আসবে ইমার্জেন্সির গেইট থেকে?
পুনশ্চঃ শুক্রবার বেলা ৩ টায় বিশেষ ব্যাবস্থায় আমার নাফিকে একজন বিশেষজ্ঞকে দেখিয়েছি। বাবাটা এখন কিছুটা ভাল আছে। আপনাদের দোয়া কাম্য।

খালেদ আহমদ
সিনিয়র রিপোর্টার, দৈনিক জালালাবাদ
পাঠাগার ও প্রকাশনা সম্পাদক, সিলেট প্রেসক্লাব

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *







© All rights reserved © 2017 Nonditosylhet24.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ