মঙ্গলবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৬:০০ অপরাহ্ন

ছোড়দিতো আর নেই

ছোড়দিতো আর নেই

নিউজটি শেয়ার করুন

ধ্রুব গৌতম :২০১২ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর। ফজরের আযানের সময় আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। স্বপ্নে দেখি মা ঘর থেকে এই ঘুটঘুটে অন্ধকারে বেরিয়ে যাচ্ছেন। উঠে ঠিকই দরজা খোলা দেখে স্বপ্নকে একেবারেই সত্যি ভাবি। দরজায় বাইরে বেরিয়ে অন্ধকারে মাকে খুজতে থাকি। রান্না ঘর,  স্নান ঘর , টয়লেট একে একে খুঁজি। বাবাকে পায়চারী করে সিগারেট খেতে দেখে বাবার কাছে মাকোথায় জানতে বাবা বললেন, তোর মাতো ক্লিনিকে। বেশ সময় নিয়ে আমার ভ্রম কাটলো। সত্যিইতো ক’দিন ধরে মাতো হাসপাতালে। তাহলে আমি যে নিজ চোখে দেখলাম, মা দরজা খুলে বেরিয়ে যাচ্ছেন। দরজাওতো খোলা। স্বপ্ন এমন সত্যি হয় কি ভাবে?

মা যখন সুস্থ ছিলেন তখন প্রতিদিন ভোর বেলা হাঁটতে বের হতেন। নানাজনের সাথে দেখা হত, কথা হত। অনেককে অনেক দিন মা সাথে করে নিয়ে এসে চা নাস্তা করায়ে দিতেন। হুট করেই বিছানা নিয়ে নিলেন। মা যেদিন বিছানা নেন, তার আগের রাতে ডাক্তার দেখায়ে এসেছিলেন। ডাক্তারের দেয়া প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ঔষধ খেতেই মা বিছানায়।

আজ ২৭সেপ্টেম্বর। আমার মা অঞ্জলি দাস সবিতা’র ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী। আমার জীবন আজ এ পর্যায়ে আসার পেছনে মায়ের চুড়ান্ত অবদান ছিলো। মায়ের মৃত্যুবার্ষিকীতে মাকে নিয়ে স্মৃতিরোমন্থন করে কৃতজ্ঞ চিত্তে মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।

সেদিন ভোর বেলা বেতারে আমার ডিউটি ছিলো। স্বপ্ন দেখে অস্থিরতা বেড়ে যায়, ঘুম মোটেও আসতে চায়নি। বাধ্য হয়ে ফ্রেস হয়ে বসে থাকি। ভোর ৫:৩০টার পর বেতারের গাড়ী আসতেই যেই না রওয়ানা দিয়েছি কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢাকা থেকে ছোট ভাই কল করে ক্লিনিকে যেতে বলে। আমি কথা না বাড়িয়ে গাড়ী থেকে নেমে ক্লিনিকের দিকে দৌড়াতে শুরু করলাম। এর মধ্যে রিক্সাওয়ালাদের বারবার অনুরোধ করার পরও শুনলো না। দৌড়ে দৌড়ে চারতলার কেবিনে এসে দেখি মায়ের নিথর দেহ পরে আছে বিছানায়। নাকে রাইস টিউব নেই, অক্সিজেনের সিলিন্ডার নেই। হাতে সেলাইনের সুঁই গাঁথা নেই। ডাক্তার মামাকে কল করে জানাতে বললেন, বিছানাপাতি গুছায়েনে, সিস্টারকে বল এ্যম্বুলেন্স ডাকতে। জিজ্ঞাসা করলাম, কেন? উত্তর দিলেন, “ছোড়দিতো বেঁচে নেই।” “ছোড়দিতো বেঁচে নেই।”, “ছোড়দিতো বেঁচে নেই।”, “ছোড়দিতো বেঁচে নেই।”- এই কথাটি বার বার আমার কানে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। মায়ের নামের আগে ‘মৃত’ শব্দটি চোখে ভাসতে লাগলো। ভাবতে লাগলাম, আজ থেকেতো আমি এতিম। চিৎকার করে কাঁদতে চাইলেও পারিপার্শ্বিক কারণে তাও করতে পারিনি।

মায়ের সাথে যে আমার খুব হৃদ্যতা ছিলো, তা কিন্তু নয়। খুব শান্তশিষ্ট, মেধাবী মানে গর্ব করার মত তেমন কোন গুণ আমার মোটেও ছিলো না। সংসারের ছয় সন্তানের পিঠাপিঠি বেড়ে উঠা। একজনতো মায়ের কোল থেকেই পরপারে চলে গেলো। তবে আমার ও আমাদের জন্য মায়ের যুদ্ধ বা সংগ্রাম ছিলো নিত্য।

১৯৭৩ সালের ১৭ আগস্ট শুক্রবার আমার জন্ম হয় সিলেট সদর হাসপাতালে। সে সময়ে বাড়ী থেকে মা হঁটে গেছেন সদর হাসপাতালে। জন্ম হয়েছে স্বাভাবিকভাবে। মা একা জানালা দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে পরিচিতজন খোঁজতে গিয়ে হঠাৎ দেখেন আমার আপন মাসতুতো দাদা (সনজয়) হেঁটে যাচ্ছেন। মা চিৎকার দিয়ে দাদাকে ডেকে আমার আগমনি সংবাদ জানালেন। দাদা বাড়িতে এসে সে সংবাদ জানাতে আস্তে আস্তে সবাই হাসপাতালে আসা শুরু করলেন। আমার জন্মটা যে বাড়ীতে খুব খুশীর বন্যা বইয়ে দিয়েছিলো, তা কিন্তু নয়, কারণ বছর বছর একটা করে সন্তান জন্ম নেয়া সুখকর ছিলো না। তার মধ্যে একটাতো চলেই গেলো। এসব ঘটনা শুনেছি মায়ের মুখ থেকেই।

আমার স্মৃতিতে মাকে ঘিরে যে সব স্মৃতি আছে তা একটু একটু করে রোমন্থন করছি। তখন আমার বয়স চার কি পাঁচ। সিলেট স্টেডিয়ামে চলছে ‘অপেরা ৭৭’। ঘর থেকে দেখা যায় স্টেডিয়ামের জমকালো আলোকসজ্জ্বা। পরিবারের সবার সাথে গেলাম ‘অপেরা ৭৭’দেখতে। সারা মাঠ জুড়ে আয়োজন। দেখলাম বনমানুষ, পুতুলনাচ আরো কত কি। সেদিন উপহার হিসেবে পেয়েছিলাম প্লাস্টিকের দুটো ব্যাট ও টেবিল টেনিসের বল। পরদিন সকালে মায়ের সামনে খেলতে গিয়ে বলটি চুলায় পড়ে চোখের সামনেই জ্বলে যায়। আমার যে কি কান্না, এখনো সে স্মৃতি ভুলতে পারি নি।

ছোট বেলা থেকেই মা ভোর বেলায় ঘুম থেকে ডেকে তুলতেন। ঘরের কাজ করতেন আর মুখে মুখে ছড়া, কবিতা, শতকিয়া, নামতা, এবিসিডি ইত্যাদি শিখাতেন। কবিতাগুলোর মধ্যে যেমন, এক চাঁদ আকাশেতে আলো করে রয়, দুই হাতে খুকুমণি চাঁদরে ডাকোয়….। এই কবিতার মাধ্যমে এক দুই শিখেছি সহজেই। মায়ের কারণে ভর্তি হই শিশু স্কুলে, যা বর্তমানে সিলেট সরকারী কিন্ডারগার্টেন স্কুল নামে পরিচিত। বিদ্যাশিক্ষার প্রথম বই হলো বন্দে আলী মিয়ার ‘আগে পড়ি’।

শিশু স্কুলে পড়ার সময় মা শিশু একাডেমীতে ভর্তি করে দেন। কবিতা আবৃত্তি, চিত্রাঙ্কন, নৃত্য, তবলা, গান ইত্যাদি সকল বিষয়েই ভর্তি হই। তখন শিশু স্কুলে বড় অনুষ্ঠান হবে। গানের দলে চান্স পেলাম। গার্লস স্কুলের রুমাদি, ঝুমাদিরা নেতৃত্ব দিতেন। গানের মহড়া দিতেন গানের শিক্ষিকা নমিতা গোস্বামী। নমিতা গোস্বামীর ছেলে গৌতম আমার সহপাঠি এবং আমার নামও গৌতম হওয়ায় আমার গ্রহণযোগ্যতা ছিলো একটু বেশী। মঞ্চে দলীয় সংগীতের পর বড়দের পরিবেশনায় নাটক হলো বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ডাকঘর নাটক। সেখানে সুধার সাথে ফুল কুড়ানির দলে থাকি। আর এর পরই মৌসুমী প্রতিযোগিতায় কবিতা আবৃত্তিতে পুরস্কার পেয়ে স্কুলে পরিচিতি লাভ করি।

সেখানে এ, বি, ওয়ান পড়ার পর চলে আসি রসময় স্কুলে। ক্লাস ফাইভে এসে ভর্তি হই সিলেট সরকারী পাইলট স্কুলে। ভর্তির জন্য মা ঘরে নিজেই পড়িয়েছেন। চান্সও পাই। মা ঘরে গানও শেখাতেন। সন্ধ্যায় হারমনি বাজিয়ে ‘ভব সাগর’সহ অনেক গান গাইতেন আমাদের সাথে নিয়ে। পাইলট স্কুলে চান্স পাওয়ায় মা ডাকটিকিটের বই উপহার দেন আমাকে। মাসতুতো ভাই মেজদা উনার ডাকটিকিটের বইও উপহার দিয়ে দেন। মায়ের সহযোগিতায় শুরু হয় ডাকটিকিট জমানো। সিলেট প্রেসক্লাবের সামনে পরে চৌহাট্টা সুনির্মল গুপ্ত বুলবুলদার ‘যায় যায় দিন’ নামক দোকান থেকে প্রতিনিয়ত ডাকটিকিট কিনতাম।

শিশু একাডেমীতে পুরস্কার পাওয়ায় লামাবাজারের প্রিয়জ্যোতি দাস বাবুদা ও উত্তম সিংহ রতনদা এসে তারা নতুন নাট্যসংগঠন করবেন বলে জানালে মা আমাকে তাদের দলভূক্ত হওয়ার অনুমতি দেন। দলের নাম ‘সন্ধানী নাট্য চক্র’। নাটক ও গানের দলে থেকে কাজ করায় শিশু শিল্পী হিসেবে তথ্য অফিস থেকে প্রকাশিত ডাইজেস্টে শিশু শিল্পী হিসেবে আমার রনাম তালিকাভূক্ত হয়।

আমার লেখালেখিতেও মায়ের অবদান সর্বাগ্রে। সে সময়ে শিশু একাডেমীতে দেয়ালিকা প্রকাশিত হত। নোটিশ দেখে মা ছড়া বা কবিতা লেখার জন্য বললেন। আমিও অতি আগ্রহী। শিশু একাডেমীথেকে প্রকাশিত ম্যাগাজিন ‘শিশু’ দিয়ে বললেন বইয়ের কবিতা ছড়ার মত হতে হবে। চেষ্টা করলাম। মার সহযোগিতায় লিখলাম, দেয়ালিকায় প্রকাশিতও হলো, হায় আমার সে কি আনন্দ। মা দেরী না করে পাড়ার নাট্যকার, গীতিকার ও সাংবাদিক নান্টুদা (বিদ্যুৎ কর) ও অজয় পাল কাকুর সান্নিধ্য পাইয়ে দিলেন। সেই থেকে আমার লেখালেখির যাত্রা শুরু।

পড়া লেখা করানোর জন্য মা’র জীবনপণ প্রচেষ্টা ছিলো। পাইলট স্কুলে ভর্তির পর ইংরেজী রচনা ‘জার্নি বাই ট্রেন’শেখানোর জন্য পুরো একটা রাত জেগেছেন কাঁথা সেলাই করে।

আমাদের সুস্থ বিনোদনের জন্য মার আগ্রহের কথা আগেই বলেছি। কুমার পাড়ায় বিশিষ্ট ব্যবসায়ী কুটি মিয়া সাহেবের বাসায় আমার মামা-মাসীরা একত্রে বসবাস করতেন। সে সময়ে বিটিভিতে মাসে একদিন একটা ছায়াছবি প্রচার করতো। যেদিন ছায়াছবি প্রচারিত হবে সেদিন মা সকল কাজ বিকালের মধ্যে শেষ করে আমাদের নিয়ে কুমার পাড়ায় আসতেন। আবহাওয়া অফিসের টাওয়ারের লাল বাতি দেখলে সেদিন বুঝতাম আমরা মামার বাসায় পৌছে গেছি। ডুমুরের ফুল, যাদুর বাঁশি, লালুভুলু, সারেংবৌ আরও কত ছবি এনে দেখিয়েছেন। বলাবাহুল্য, সে সময় ঘরে ঘরে টেলিভিশন ছিলো না। কিছু দিন পর অবশ্য নিজের বাড়ীতেও টিভি চলে আসে।

ছোটবেলা কেটেছে মায়ের চূড়ান্ত শাসনে। তবে যতটা শাস্তি পেয়েছি তার সবগুলোই বিনা অপরাধে। যেমন একদিন মা আমাকে লাঠি দিয়ে মারতে গিয়ে মাথা ফাটিয়ে দেন। অভিযোগ ছিলো দুষ্টুমীর। সত্যিই সেদিন সে সময়ে আমি দুষ্টুমী করিনি। আমাদের বাড়িতেসে সময়ে ‘রাকেশ’ নামে আমাদের এক জ্যাঠা থাকতেন। সময় সময় আমাদের বাচ্চাদের টাকা পয়সা, চকলেট দিতেন। একদিন এরকম টাকা দিতে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসলো আমি জ্যাঠার টাকায় হাত দিয়েছি। দুই হরিণের ছবিওয়ালা দু টাকা। অভিযোগের সাথে সাথেই সত্য-মিথ্যা বিচার না করে শাস্তি। মা আমাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে মাঝ পুকুরে দাঁড় করিয়ে রাখেন অর্ধেক দিন। আমি হলফ করে বলতে পারি, আমি সেদিন টাকায় হাত দেই নি। আজ নিজে সরকারী চাকুরী করে টাকা রোজগার করলেও সেদিনের শাস্তি আজও ভুলতে পারিনি।

আমার জীবনের পরম প্রাপ্তি আমাকে নিয়ে আমার মার একটি ছোট্ট অনুভূতিমূলক লেখা। একবার আমার জন্মদিনে কবি ও সাংবাদিক সুমন কুমার দাশ ‘ধ্রুব’ নামে জন্মদিনের এক স্মারক প্রকাশ করে। এতে মা আমাকে নিয়ে একটি লেখা দেন। এতো আবেগ ও স্বীকৃতিমূলক লেখা যার থেকে শ্রেষ্ঠ কোন উপহার আমার জীবনে নেই।

প্রত্যেক বাবা মা তার সন্তানকে শাসন করেন আদর্শবান সন্তান হওয়ার জন্য। জন্মদান প্রতিপালন থেকে শুরু করে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তাদের স্বপ্ন আর শ্রম অগ্রাহ্য করার কোন উপায় নেই। আমার মাও এ দিক থেকে পিছিয়ে ছিলেন না। মায়ের ত্যাগ, তিতিক্ষাসহ সকল যুদ্ধই ছিলো আমাদের প্রকৃত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। তবে এ চরম সত্য যে সে সময়ে, সে বয়সে তা বুঝে উঠতে পারিনি।

আজকের শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের প্রতি অনুরোধ তারা যেন বাবা-মায়ের অনুগত সন্তান হয়। বাবা মায়ের ম্বপ্নকে স্বার্থকরূপে পরিপূরণের মত স্বর্গ সুখের কোন বিকল্প নেই। আজ বাবা মায়ের কথা শুনে মানুষ হওয়ার সুযোগ আর নেই। দিন চলে গেছে। তাদের কষ্টের কথা যখন হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করতে পারছি তখন তারা দুজনই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। সকলের প্রতি আকূল মিনতি আপনারা আমার প্রয়াত মায়ের প্রতি, আমার প্রতি আপনাদের আশীর্ব্বাদ রাখবেন। প্রত্যেক সন্তান যেন সুসন্তান হয়ে পৃথিবীকে সুন্দর একটা বাসযোগ্য করে তুলতে পারে।

ধ্রুব গৌতম

সাহিত্যকর্মী

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *







© All rights reserved © 2017 Nonditosylhet24.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ