সোমবার, ২১ অক্টোবর ২০১৯, ১২:৪৯ পূর্বাহ্ন

নগর-মহানগর একাকার

নিউজটি শেয়ার করুন

নন্দিত ডেস্ক:রাজধানী ঢাকাই নয়, দেশের বিভিন্ন নগর-মহানগরেও সমানতালে পাল্লা দিয়ে ডেঙ্গুর ভয়ঙ্কর বিস্তার ঘটছে। প্রথমে রাজধানীকেন্দ্রিক হলেও পরে ধাপে ধাপে বিস্তার ঘটিয়ে ডেঙ্গু এখন দেশের ৬১ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। গত সোমবার দেশের ৫০ জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের খবর এসেছিল। গতকাল মঙ্গলবার নতুন করে ১১ জেলা- ফরিদপুর, বান্দরবান, মাগুরা, নড়াইল, মেহেরপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, জামালপুর ও শেরপুরে ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু নিয়ে এখন সর্বত্রই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। সংশ্নিষ্টরা আশঙ্কা করছেন এর বিস্তার গ্রামেও পৌঁছাবে।

গতকাল বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আসলাম খান ও সোহেল নামে দুই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হয়েছে। গত সোমবার রাতে বাকেরগঞ্জের বাসিন্দা আসলাম এবং পিরোজপুরের কাউখালীর গোসনতারার বাসিন্দা সোহেলকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। বরিশাল শেরেবাংলা

মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন বলেন, সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে আসলাম এবং রাত দেড়টার দিকে সোহেলকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তারা দু’জনই ডেঙ্গু আক্রান্ত ছিলেন এবং তাদের শারীরিক অবস্থাও গুরুতর ছিল। পরিচালক আরও বলেন, রোগীর স্বজনরা তাকে জানিয়েছেন, দু’জনই ঢাকায় থাকেন। অসুস্থ হওয়ার পর তারা গ্রামের বাড়িতে চলে আসেন। ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পরও তারা সঠিক চিকিৎসা নেননি বলেই মনে হচ্ছে। তাদের রক্তচাপ দ্রুত কমে যায় এবং একপর্যায়ে মৃত্যু হয়।

গতকাল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডেঙ্গু আক্রান্ত দু’জনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গু জ্বরে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৪৭ জনে দাঁড়াল। আর সারাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা ১৫ হাজার ৩৬৯ জন।

গতকাল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও এর আওতাভুক্ত সব অধিদপ্তর ও পরিপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঈদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও এ সংক্রান্ত সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগও তিন দিনের কর্মসূচি শুরু করেছে। গতকাল রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের বিশেষ জরুরি বৈঠকে লন্ডন থেকে টেলিকনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবাইকে যার যার অবস্থান থেকে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

গ্রামে ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা :আসন্ন ঈদ কেন্দ্র করে গ্রামেও ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রতিবছর এক কোটিরও বেশি মানুষ গ্রামে পরিবার-পরিজন ও স্বজনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে ঢাকা ছাড়েন। তাদের মধ্যে ডেঙ্গু বহনকারী ব্যক্তির মাধ্যমে সংক্রমিত হয়ে রাজধানীর মতো গ্রামেও এই রোগের ভয়াবহতা দেখা দিতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ আসন্ন ঈদে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বনের পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার কামড় খেয়ে জ্বর নিয়ে কেউ গ্রামে গেলে এবং ওই আক্রান্ত ব্যক্তিকে গ্রামের মশা কামড়ালে সেই মশার মাধ্যমে সংক্রমিত হয়ে অন্যরাও ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হবেন। সে কারণে জ্বর নিয়ে গ্রামে ঈদ করতে যাওয়া মানে অন্যকেও বিপদে ফেলা।

মহাপরিচালক আরও বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীকে সার্বক্ষণিক নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। গ্রামের অনেক এলাকায় প্রশিক্ষিত চিকিৎসক নেই। সেক্ষেত্রে সুচিকিৎসার সংকটের কারণে প্রাণহানির মতো ঘটনাও ঘটতে পারে।

ডা. আবুল কালাম আজাদ আরও বলেন, ঢাকার বাইরে চিকিৎসাধীন রোগীদের বিষয়ে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ও সিভিল সার্জনদের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পেরেছেন, বেশিরভাগ রোগী জ্বর নিয়ে ঢাকা থেকে বাড়িতে গিয়ে ডেঙ্গু ধরা পড়েছে। এ কারণেই আসন্ন ঈদে জ্বর নিয়ে গ্রামে যাওয়ার ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান জানান, ঢাকায় জ্বরে আক্রান্ত হওয়ার পর কেউ গ্রামে গেলে বিপদে পড়তে পারেন। কারণ এডিস মশার সংক্রমণে ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে গ্রামে গেলে সেখানকার মশা ওই ব্যক্তিকে কামড় দিলে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ঘটবে। আবার ওই মশা কোনো ব্যক্তিকে কামড়ালে সেই ব্যক্তিরও আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। সুতরাং জ্বর নিয়ে গ্রামে গিয়ে সেখানকার মানুষদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলা ঠিক হবে না। এক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

৬১ জেলায় বিস্তার :স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম গতকাল নতুন করে ১১ জেলায় ডেঙ্গু রোগী পাওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছে। ৬১ জেলায় এ পর্যন্ত এক হাজার ৮৪৫ জনের আক্রান্ত হওয়ার খবর মিলেছে। তাদের মধ্যে বরিশালে দু’জনের মৃত্যু হয়েছে।

ঢাকা বিভাগ :ঢাকা বিভাগের ঢাকা জেলায় ১৫৯ জন, গাজীপুরে ৯৯, গোপালগঞ্জে ১০, মাদারীপুরে ১৭, মানিকগঞ্জে ৩২, নরসিংদীতে ২১, রাজবাড়ী ২৭, শরীয়তপুরে ৯, টাঙ্গাইলে ৩৭, মুন্সীগঞ্জে ১৮, কিশোরগঞ্জে ৮৪, নারায়ণগঞ্জে ১৯ এবং ফরিদপুরে ২ জনসহ মোট ৫৩৪ জন আক্রান্ত হয়েছে।

চট্টগ্রাম বিভাগ:চট্টগ্রাম বিভাগের চট্টগ্রাম জেলায় ১৪৩ জন, ফেনীতে ৭০, কুমিল্লায় ৫১, চাঁদপুরে ৮৮, ব্রাহ্মনবাড়িয়ায় ২০, লক্ষ্মীপুরে ২২, নোয়াখালীতে ৩০, কক্সবাজারে ১৩, খাগড়াছড়িতে ৫, রাঙামাটিতে ৩ এবং বান্দরবানে ১ জনসহ মোট ৪৪৬ জন আক্রান্ত হয়েছে।

খুলনা বিভাগ :খুলনা জেলায় ১২৮ জন, কুষ্টিয়ায় ৫৮, মাগুরায় ৩, নড়াইলে ২, যশোরে ৭১, ঝিনাইদহে ২৫, বাগেরহাটে ৮, সাতক্ষীরায় ১৭, চুয়াডাঙ্গায় ৬ ও মেহেরপুরে ১ জনসহ মোট ৩১৯ জন আক্রান্ত হয়েছে।

রাজশাহী বিভাগ :রাজশাহী জেলায় ৬২ জন, বগুড়ায় ৯২, পাবনায় ৪৭, সিরাজগঞ্জে ১৯, নওগাঁয় ৩, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১১ ও নাটোরে ২ জনসহ মোট ২৩৬ জন আক্রান্ত হয়েছে।

রংপুর বিভাগ :রংপুর জেলায় ৬২ জন, লালমনিরহাটে ২, কুড়িগ্রামে ৫, গাইবান্ধায় ৪, নীলফামারীতে ৫, দিনাজপুরে ১৭, পঞ্চগড়ে ১ ও ঠাকুরগাঁওয়ে ৬ জনসহ মোট ১০২ জন আক্রান্ত হয়েছে।

বরিশাল বিভাগ :বরিশাল জেলায় ৪২ জন, পটুয়াখালীতে ১২, ভোলায় ৬, পিরোজপুরে ২ ও ঝালকাঠিতে ১ জনসহ মোট ৬৩ জন আক্রান্ত হয়েছে।

সিলেট বিভাগ : সিলেট জেলায় ৮০ জন, সুনামগঞ্জে ৪, হবিগঞ্জে ৭, মৌলভীবাজারে ৭ জনসহ মোট ১০৭ জন আক্রান্ত হয়েছে।

ময়মনসিংহ বিভাগ :জামালপুরে ২৭ জন এবং শেরপুরে ১১ জনসহ মোট ৩৮ আক্রান্ত হয়েছে।

প্রতিদিনই রোগী বাড়ছে :গত চব্বিশ ঘণ্টায় নতুন করে এক হাজার ৩৩৫ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে। এর আগের দিন সোমবার এক হাজার ১৬৬ জন আক্রান্ত হয়েছিল। প্রতিদিনই আক্রান্তের সংখ্যা রেকর্ড গড়ছে। চলতি মাসে গতকাল পর্যন্ত এ নিয়ে ১৩ হাজার ১৮২ জন আক্রান্ত হয়েছে। সব মিলে চলতি বছর রাজধানীতে আক্রান্তের সংখ্যা ১৪ হাজার ৭৯২ জন। মাসের হিসেবে এটিও রেকর্ড। সারাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা ১৫ হাজার ৩৬৯ জন। এটিও ১৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ আক্রান্তের সংখ্যা।

আক্রান্ত ও মৃতের হিসাব নিয়ে লুকোচুরি : ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা সঠিকভাবে আসছে না। রাজধানীতে সরকারি ১৩টি ও বেসরকারি ৩৬টি হাসপাতালে ভর্তি রোগীর তালিকা ধরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আক্রান্তের এই সংখ্যা নির্ধারণ করে। কিন্তু এই হিসাবের বাইরে রাজধানীতে আরও প্রায় সাড়ে তিনশ’ বেসরকারি হাসপাতাল ক্লিনিক রয়েছে এবং সেগুলোতেও উপচেপড়া ভিড় রয়েছে। কিন্তু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তালিকায় সেই রোগীর হিসাব নেই। এমনকি হাসপাতালের আউটডোর থেকে চিকিৎসা নিয়ে যারা বাসায় ফেরেন তাদের তালিকাও নেই। এমনকি ঢাকার বাইরে শুধু সরকারি প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর তালিকা পাঠানো হচ্ছে। এর বাইরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কোনো তালিকা নেই। মৃত্যুর হিসাবও সঠিকভাবে নেই কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে। এ পর্যন্ত ৪৭ জনের মৃত্যু হলেও অধিদপ্তর ৮ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করতে পেরেছে। মৃত্যু নিশ্চিত করা সংস্থা আইইডিসিআর,বির ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অন্তত তিন শীর্ষ ব্যক্তির কাছে জানতে চাইলে তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। আইইডিসিআর পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদি ফ্লোরা মৃত্যুর হিসাব নিয়ে সব সময়ই একই কথা বলে আসছেন। তার বক্তব্য ডেঙ্গুতে মৃত্যুর বিষয় শনাক্ত করতে একটি কমিটি আছে। তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যখন শতভাগ নিশ্চিত হয়, তখনই ঘোষণা দেওয়া হয়। কতজনের বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে, তা জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেন তিনি। শতভাগ নিশ্চিত হয়েই মৃতের সংখ্যা প্রকাশ করবেন। কবে তিনি এই মৃত্যুর সংখ্যা প্রকাশ করতে পারবেন তাও জানাতে পারেননি।

গত বছর চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত ও মৃত ব্যক্তির তালিকা চাওয়ার পরও তিনি এমন বক্তব্য দিয়েছিলেন। আজ পর্যন্ত আক্রান্ত ও মৃত ব্যক্তির তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *







© All rights reserved © 2017 Nonditosylhet24.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ