বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ০৩:১৩ পূর্বাহ্ন

‘ভিআইপির অপেক্ষায়  কেড়ে নিল স্কুল ছাত্রের প্রাণ’

‘ভিআইপির অপেক্ষায়  কেড়ে নিল স্কুল ছাত্রের প্রাণ’

ছবি সংগৃহীত

নিউজটি শেয়ার করুন

নন্দিত ডেস্ক: নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আব্দুস সবুর মন্ডলের গাড়ির অপেক্ষায় প্রায় ৩ ঘণ্টা ফেরি বসে থাকায় ঘাটে আটকে পড়া অ্যাম্বুলেন্সে স্কুলছাত্র তিতাস ঘোষের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আশপাশের লোকজনের অনুরোধের পরও মাদারীপুরের শিবচরের কাঁঠালবাড়ি ঘাট থেকে ফেরি ছাড়েনি বলে অভিযোগ স্বজনদের। এমনকি প্রতিকার মেলেনি জরুরি নাম্বার ৯৯৯ এ ফোন করেও। ওই স্কুলছাত্রের মৃত্যুর চারদিন পর বিষয়টি প্রকাশিত হয়।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ঘাটে কর্তব্যরত বিআইডব্লিউটিসি কর্মকর্তা ও পুলিশ সদস্যদের দাবি, তাদের কাছে স্বজনরা রোগীর অবস্থা জানানোর সঙ্গে সঙ্গে সকল ধরনের সহযোগিতা করা হয়। এ বিষয় বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যান খোঁজ নিয়েছেন বলে কাঁঠালবাড়ি ঘাট ম্যানেজার আব্দুস সালাম দাবি করেন।

নিহতের স্বজনদের অভিযোগ, নড়াইল কালিয়া পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৬ষ্ট শ্রেণির ছাত্র তিতাস ঘোষ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ায় প্রথমে খুলনার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত বৃহস্পতিবার তাকে আইসিইউ সম্বলিত অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছিল।

রাত ৮টার দিকে মাদারীপুরের কাঠালবাড়ী ১নং ফেরি ঘাটে পৌঁছায় অ্যাম্বুলেন্সটি। রাত ৯ টার দিক কুমিল্লা নামের ফেরিটি শিমুলিয়া থেকে কাঠালবাড়ি ঘাটে এসে গাড়ি আনলোড করছিল। এ সময় ওই রোগীর লোকজন ঘাটে কর্মরতদের তাদের রোগীর অবস্থা বললেও গাড়ি আনলোড শেষে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব আবদুস সবুর মন্ডলের গাড়ি না আসা পর্যন্ত ফেরি ছাড়তে রাজি হয়নি ঘাট কর্তৃপক্ষ।

তিতাস ঘোষের বড় বোন তন্নীসা ঘোষ জানান, উন্নত চিকিৎসার জন্য বৃস্পতিবার রাতেই তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে পাঠানোর কথা বলেন চিকিৎসক। তাই চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রেখে দ্রুত ঢাকায় পৌঁছাতে অর্ধলাখ টাকায় ভাড়া করা হয় আইসিইউ সংবলিত অ্যাম্বুলেন্স। অ্যাম্বুলেন্সটি ঘাটে এসে থামে রাত ৮টার দিকে। ঘাটে ফেরি পারাপারের জন্য তারা ঘাট কর্তৃপক্ষ ও দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের কাছে সাহায্য চান। কিন্তু কোনো সাহায্য পাওয়া যায়নি। তিন ঘণ্টা অপেক্ষায় থাকার পরে রাত পৌনে ১১ টার দিকে সাদা রঙের নোয়া মাইক্রোবাসটি ফেরিতে ওঠার পরে ছাড়া হয় ফেরি। ফেরিটি ছাড়ার আধা ঘণ্টার মধ্যেই মাঝ নদীতে মারা যায় তিতাস।

তিনি বলেন, আমার ভাইয়ের জীবন কেড়ে নিল ভিআইপি ওই ব্যক্তি। এ দেশে জীবনের দাম বেশি না, ভিআইপিদের দাম বেশি? সরকারের উচিত এই ভিআইপিকে আইনের আওতায় আনা। আমার ভাইয়ের হত্যা বিচার চাই।

তিতাসের মা সোনামণি ঘোষ বলেন, ‘বাবা তোমাগো কাছে বললে কী আমার পোলারে পামু? ওরা আমার পোলারে মেরে ফেলছে। আমি ফেরিওয়ালাগো পায় ধরছি, তবুও ওরা ফেরি ছাড়ে নাই। ফেরি ঠিক মতোন গেলে হয়তো পোলাডা বাঁইচা যাইতো। আমাগো কান্না ওদের অন্তর গলে নাই।’

নিহত তিতাসের মামা বিজয় ঘোষ বলেন, ‘ফেরির লোকদের কাছে জিজ্ঞাসা করলে তারা বলে মন্ত্রী আসবে, ভিআইপি আসবে। আমাদের রোগী যে মরে যাচ্ছে, সেদিকে তাদের কোনো নজর নেই। কোনো সহযোগিতা না পেয়ে দিলাম ৯৯৯ কল। কিন্তু সেখানেও কোনো কাজ হলো না।’

জানা গেছে, দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর রাত পৌনে এগারোটার দিক নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের স্টিকার লাগানো সাদা রংয়ের নোহা মাইক্রোবাসটি আসার পর ফেরি ছাড়ে। ফেরিটি মাঝ নদীতে পৌঁছালে মস্তিস্কে প্রচুর রক্তক্ষরণে আম্বুলেন্সেই মৃত্যু হয় তিতাসের। পরে শিমুলিয়া ঘাট থেকে আবারও ফেরিতে কাঁঠালবাড়ি ঘাট পৌঁছে ওই পরিবারটি তিতাসের লাশ নিয়ে নড়াইলে ফিরে যায়।

তবে পুলিশ ও ঘাটে কর্তব্যরত বিআইডব্লিউটিসি কর্মকর্তাদের দাবি, তাদের কাছে ওই পরিবারের পক্ষ থেকে যখন রোগীর কথা জানানো হয়, তখনি তাদের অ্যাম্বুলেন্স ফেরিতে লোড করে ১০ মিনিটের মধ্যেই ঘাট থেকে কুমিল্লা ফেরিটি শিমুলিয়ার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। আর নৌ-পরিবহন মন্ত্রনালয়ের ওই অতিরিক্ত সচিবের জন্য খুব বেশি দেরি করেনি ফেরিটি।

কুমিল্লা ফেরির মাস্টার ইনচার্জ মো. সামসুল আলম বলেন, ফেরিটি কাঁঠালবাড়ি ঘাটে আসার পর ভিআইপি যাত্রীর জন্য আমাকে খুব বেশি হলে আধঘণ্টার মতো অপেক্ষা করতে হয়েছিল। রাত আনুমানিক ১০ টার দিক ফেরি ছাড়ার কিছুক্ষণ পরই অ্যাম্বুলেন্সে থাকা রোগীর মৃত্যু হয় বলে জানতে পারি।

কাঠালবাড়ি ঘাটে সেই সময় কর্তব্যরত বিআইডব্লিউটিসির টিএস ফিরোজ আলম বলেন, ওই দিন আমি অন্য ঘাটে দায়িত্বে ছিলাম। আমাকে সাংবাদিক ও রোগীর স্বজন পরিচয় দিয়ে একজন ফোন করে তিতাস নামক ওই রোগীর অবস্থার কথা জানালে আমি পাশের ঘাট থেকে দ্রুত এসে অ্যাম্বুলেন্সটি ফেরিতে তুলে দেই। পরে ১০ মিনিটের মধ্যে ফেরিটিও ঘাট থেকে ছেড়ে যায়।

কাঁঠালবাড়ি ঘাট ট্রফিক ইন্সপেক্টর উত্তম শর্মা বলেন, ‘ওই পরিবারের পক্ষ থেকে ফোন করার সঙ্গে সঙ্গে ঘাটে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা অ্যাম্বুলেন্স ফেরিতে তুলে দিয়েছিল। আমরা তাদের সকল ধরনের সহযোগিতা করেছি।’

বিআইডব্লিউটিসি কাঁঠালবাড়ি ঘাট ম্যানেজার আব্দুস সালাম বলেন, মাদারীপুর জেলা প্রশাসক মো. ওয়াহিদুল ইসলাম সেদিন তার কার্যালয়ে একটি সভায় যুগ্ম সচিব স্যারের কথা আমাকে জানিয়ে তার নাম্বার দেন। যুগ্ম সচিবকে পারাপার করার জন্য ঘাটে কোন ফেরি রাখা ছিল না। তাকে বহনকারী গাড়িটি ঘাটের কাছাকাছি চলে আসার ফোন পেয়ে কুমিল্লা ফেরিটি অ্যাম্বুলেন্সসহ সকল গাড়ি লোড দিয়ে সচিবের গাড়ির জন্য ১০ থেকে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করেছিল বলে জানতে পেরেছি।

এব্যাপারে মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক ওয়াহিদুল ইসলাম জানান, আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ফোন করে ঘাটের ব্যপারে আমাকে জানান। আমি ওই সময়ে ঘাটের আইনশৃঙ্খলা বিষয়ে মিটিংয়ে ছিলাম। সেখানে ঘাটের দায়িত্বরত কর্মকর্তাও ছিলেন। আমি তাকে বলেছি যুগ্ম সচিব মহোদয় ফেরিতে যাবেন। উর্ধতন কর্তৃপক্ষ আমাকে জানালে আমার দায়িত্ব বিষয়টি ঘাট কর্তৃপক্ষকে জানানো, বিষয়টি তাদের জানানো ছাড়া আর কিছু নয়। তবে ফেরিতে আ্যম্বুলেন্স না তুলে সচিবের জন্য অপেক্ষা করার বিষয়টি আমাকে জানানো হয়নি। সচিব মহোদয়ের জন্য ফেরি অপেক্ষা করার বিষয়টি সম্পূর্ন ঘাট কর্তৃপক্ষের বিষয়, আমি আ্যম্বুলেন্স বসিয়ে রেখে সচিব মহোদয়কে নিতে হবে এমন কোন কথা বলিনি।

তিনি জানান, তিতাসের মৃত্যুর ঘটনায় ঘাট কর্তৃপক্ষের কোনো অবহেলা আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৪ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ৭ কার্য দিবসের মধ্যে কমিটিকে রিপোর্ট দিতে হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *







© All rights reserved © 2017 Nonditosylhet24.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ