বৃহস্পতিবার, ১৮ Jul ২০১৯, ১০:৫৩ পূর্বাহ্ন

মালয়েশিয়া থেকে ফিরতে হচ্ছে কয়েক লাখ বাংলাদেশি শ্রমিককে

মালয়েশিয়া থেকে ফিরতে হচ্ছে কয়েক লাখ বাংলাদেশি শ্রমিককে

ছবি: সংগৃহীত

নিউজটি শেয়ার করুন

নন্দিত ডেস্ক:আউটসোর্সিং কোম্পানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন রাসেল আহমেদ হৃদয়ের মতো কয়েক লাখ বাংলাদেশি, ভিসা নবায়নের নতুন কোনো সুযোগ না দিলে এই মেয়াদ শেষে বাধ্য হয়ে দেশে ফিরতে হবে তাদের/ ছবি: সংগৃহীত

সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখা ও আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার দোহাই দিয়ে কয়েক লাখ বাংলাদেশি শ্রমিককে দেশে ফেরত পাঠাচ্ছে মালয়েশিয়া সরকার। এই লক্ষ্যে প্রায় ২৭৯টি আউটসোর্সিং কোম্পানি বন্ধ করে দিয়েছে দেশটি। ফলে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন এসব কোম্পানির মাধ্যমে মালয়েশিয়া যাওয়া শ্রমিকরা। সেই সাথে ক্ষতির মুখে পড়বেন মালয়েশিয়া যেতে কোম্পানিগুলোর সাথে চুক্তিবদ্ধ বাংলাদেশিরাও।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গতকাল ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশটির আউসোর্সিং কোম্পানিগুলো তালিকা করে বন্ধ করা হয়েছে। এই কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে লাখ লাখ শ্রমিক চুক্তিভিত্তিকভাবে মালয়েশিয়ায় গেছেন। ফলে এই কোম্পানিগুলো বন্ধ হওয়ায় মালয়েশিয়া থেকে নির্বাসিত হওয়ার আশঙ্কায় পড়েছেন এসব অভিবাসীরা। তাদের আর নতুন করে ভিসা নবায়ন নাও হতে পারে।

মালয়েশিয়ান কর্মকর্তারা বলেছেন, মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। যার মধ্যে দুই লাখ শ্রমিকের ভিসা নবায়ন না হলে তাদের দেশে ফিরতে হবে। আর অনিয়মিত আরও চার লাখ শ্রমিককে দেশে ফিরতে হতে পারে। ফলে প্রায় ছয় লাখ শ্রমিক এখন অনেকটাই অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। সেদেশের কর্তৃপক্ষ অবৈধ অভিবাসীদের আর বৈধ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

এলএলএইচ গোল্ডেন এসডিএন বিএইডি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধভাবে ২০১৪ সালে মালয়েশিয়া যান রাসেল আহমেদ হৃদয় নামের এক বাংলাদেশি যুবক। এক বছর পর আউটসোর্সিং কোম্পানির মাধ্যমে ভিসার মেয়াদ বাড়িয়ে নেন তিনি। গতকাল এই কোম্পানির আউটসোর্সিং বিভাগ বন্ধ করে দিয়েছে সে দেশের সরকার। এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন তিনি।

হৃদয় বার্তা২৪.কম-কে বলেন, ‘মালয়েশিয়ান সরকারের এমন সিদ্ধান্তের ফলে চরম অনিশ্চিয়তায় পড়েছি। লাখ লাখ টাকা দিয়ে অনেকে ভিসার মেয়াদ বাড়িয়েছে। এখন এসব কোম্পানির আউটসোর্সিং বিভাগ বন্ধ হওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছি আমরা।’

এদিকে দেশটির অভিবাসন বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও দেশটিতে অবৈধদের বসবাস ঠেকাতে বিভাগটি কাজ করছে এবং দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার তাগিদে কোনো পক্ষের সঙ্গে আপোস করা হবে না।

এদিকে গত ৭ থেকে ৮ মার্চ মালয়েশিয়ায় সেদেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠক করেছে বাংলাদেশি প্রতিনিধিদল। যার নেতৃত্ব দিয়েছেন সংসদ সদস্য ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির সদস্য ইসরাফিল আলম।

তিনি বলছেন, মালয়েশিয়ার কর্মকর্তারা বলেছেন তারা আর অবৈধ অভিবাসীদের বৈধ করবেন না। মালয়েশিয়ায় ছয় লাখেরও বেশি অনিয়মিত বাংলাদেশি রয়েছে এবং তাদেরকে নির্বাসিত করা হতে পারে। তবে ছয় লাখের মধ্যে তিন লাখ শ্রমিকের ভিসা সংক্রান্ত কাগজপত্র বৈধকরণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলেও বাকি তিন লাখের ক্ষেত্রে তা হয়নি।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার শহীদুল ইসলাম বলছেন, আউটসোর্সিং কোম্পানিগুলো বন্ধের ক্ষেত্রে হাইকমিশনের সাথে ঐ কোম্পানি অথবা মালয়েশিয়া সরকার যোগাযোগ করেনি। তবে এটি একটি ভাল পদক্ষেপ। ২০১৬ সালের পর আউটসোর্সিং কোম্পানির মাধ্যমে আর বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ করা হয়নি। তবে এর আগে বহু সংখ্যক বাংলাদেশি শ্রমিক আউটসোর্সিং কোম্পানির মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ করা হয়েছে। মূলত অভিবাসন আইন লঙ্ঘনকারীদেরই আটক করা হয়ে থাকে।

এ বিষয়ে আউটসোর্সিং কোম্পানি বিপি অ্যাডভান্সের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশ না করা শর্তে এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিষ্ঠানটির মালিকদের মধ্যে দুই জন বাংলাদেশি ও একজন ভারতীয়। বাংলাদেশি দুই মালিক গত তিন বছরে প্রায় ৮০ জনের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন ভিসা প্রক্রিয়ার জন্য। কিন্তু তাদের ভিসা এখনো হয়নি। ফলে তাদের পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। আর আউটসোর্সিং বিভাগ বন্ধ হওয়ায় তাদের ভিসা হওয়ার সম্ভবনাও নেই।

মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে শুরু করে ২১ মার্চ পর্যন্ত মালয়েশিয়ার বিভিন্ন জায়গায় অবৈধ অভিবাসীদের আটকের লক্ষ্যে চার হাজার ৪৫৪টি অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে আটক করা হয় ৬৩ হাজার ২৮৬ অভিবাসীকে। এদের মধ্যে তিন হাজার ১৬৪ জন বাংলাদেশি রয়েছেন। কাগজপত্র যাচাই-বাছাই শেষে আটকদের মধ্য থেকে গ্রেফতার করা হয় বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের ১৩ হাজার ৬৭৭ জন অবৈধ অভিবাসীকে।

তবে শুধু শ্রমিকই নয়, অবৈধ অভিবাসী রাখার অপরাধে গ্রেফতার করা হয় ৩১১ জন স্থানীয় মালিককে। আটকদের মধ্যে ইন্দোনেশিয়ান চার হাজার ৭২৯, ফিলিপাইন এক হাজার ৩৬২, মিয়ানমার এক হাজার ৩৫৭ জন। এছাড়াও ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ও ভিয়েতনামের নাগরিকরাও আটক হন।

মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন রেগুলেশন অনুযায়ী জিজ্ঞাসাবাদ করে কাগজপত্র থাকলে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় জেল-জরিমানা করা হচ্ছে বলে জানান ইমিগ্রেশনের মহাপরিচালক দাতুক ইন্দিরা খায়রুল দাজাইমি। দেশটির অভিবাসন বিভাগের ঘোষণা অনুযায়ী-মালয়েশিয়ায় অবৈধ বিদেশিকে কোনোভাবেই অবস্থান করতে দেয়া হবে না।

এছাড়া গত বছর ৭২ হাজার ৩৬১ জনকে পাসপোর্ট ও ভিসা জটিলতার কারণে অভিবাসন আইনে পাঁচ বছরের জন্য মালয়েশিয়ায় প্রবেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রতিদিনই অবৈধ অবস্থানের অভিযোগ এনে ধরপাকড় চলছে। কুয়ালালামপুরের বাইরেও যেসব এলাকায় বাংলাদেশিদের অবস্থান বেশি ঐসব এলাকায় চলছে অভিযান।

মালয়েশিয়া প্রবাসী কমিউনিটি নেতারা বলছেন, ‘ভয়ে ভয়ে দিন-কাটানো এই অবৈধ বাংলাদেশিরা অনেকেই অভিযোগ করছেন, কথিত এজেন্টদের হাতে প্রতারিত হওয়াতেই তারা আজ অবধি দেশটির বৈধ শ্রমিকের স্বীকৃতি পাননি। বহুদিন মালয়েশিয়ায় থাকার পরও যাদের বৈধ কাগজপত্র নেই, এই ধরপাকড় অভিযান নিয়ে তাদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক বিরাজ করছে।

এদিকে মালয়েশিয়ার মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, অভিবাসীরা স্ব-ইচ্ছায় দেশে ফিরতে পারেন। তবে জোরপূর্বক কাউকে দেশে ফেরানো যুক্তিসঙ্গত নয়। এক্ষেত্রে সরকারের সঠিক উদ্যোগ জরুরি।

এর আগে মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসীদের বৈধ হওয়ার জন্য পরিচালিত রি-হিয়ারিং প্রোগ্রাম শেষ হয়েছিল গত বছরের ৩০ জুন। এরপর আরও এক মাস সময় বাড়িয়ে ৩০ আগস্টের মধ্যে স্বেচ্ছায় দেশে যাওয়ার সময় বেঁধে দিয়েছিল দেশটির সরকার। ইতোমধ্যে সেই সময়ও শেষ হয়ে গেছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *







© All rights reserved © 2017 Nonditosylhet24.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ