রবিবার, ২৫ অগাস্ট ২০১৯, ১০:৩৪ পূর্বাহ্ন

সাত বছরেও জানা গেলনা ইলিয়াস আলী জীবিত না মৃত

সাত বছরেও জানা গেলনা ইলিয়াস আলী জীবিত না মৃত

নিউজটি শেয়ার করুন

খালেদ আহমদ : বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর নিখোঁজের সাত বছর পূর্ণ হলো আজ । ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল মধ্যরাতে রাজধানী ঢাকার বনানী থেকে গাড়িচালক আনছার আলীসহ নিখোঁজ হন তিনি । এই সাত বছরেও জানা গেলনা ইলিয়াস এবং তার গাড়ি চালক আনছার জীবিত না মৃত ? এখনো তাকে ফিরে পাওয়ার আসায় মুখিয়ে আছেন তার স্ত্রী, সন্তানসহ স্বজনরা। দলীয় নেতাকর্মীরা ও প্রতিবছর ফিরে কর্মসূচী দিয়েই ক্ষ্যান্ত হন। এই অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়ে ইলিয়াস আলী ফিরে আসবেন সেই এখনো সেই বিশ্বাস তাঁর স্বজনদের। নিখোঁজের ঘটনায় ডিএমপির বনানী থানায় দায়েরকৃত সাধারণ ডায়েরীর এখনো তদন্ত চলছে। সিলেট-২ আসনের সাবেক এমপি ও বিএনপির সিলেট বিভাগীয় সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এম. ইলিয়াস আলী ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাতে ঢাকার বনানী থেকে ব্যক্তিগত গাড়িচালক আনসার আলীসহ রহস্যজনকভাবে ‘নিখোঁজ’ হন। পরিত্যক্ত অবস্থায় তাঁর ব্যাক্তিগত গাড়িটি উদ্ধার করে বনানী থানা পুলিশ। ঐদিন সিলেট থেকে সন্ধ্যায় ঢাকায় ফিরেন ইলিয়াস। রাতে বাসায় ফেরার পথে নিখোঁজ হন বিএনপির এই আলোচিত নেতা। ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হবার খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠে সিলেটসহ সারা দেশ। তাঁর নিজ এলাকা বিশ্বনাথের মানুষ রশিদপুরে মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। ১৮ এপ্রিল রশিদপুরে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে বিএনপির ২০ জন নেতাকর্মী আহত হন। রোববার সিলেটে হরতালের ডাক দেয় বিএনপি। ইলিয়াসের ভালবাসায় আন্দোলন করতে গিয়ে প্রাণ দেন বিশ্বনাথের তিন বিএনপির কর্মী। ফিরে পাওয়ার আন্দোলন করতে গিয়ে হামলা-মামলা শিকার হন হাজার হাজার বিএনপি-জামায়াত কর্মী ও সাধারণ মানুষ। মামলায় কারাবরণ করেন বিএনপি নেতাকর্মীসহ শত শত সাধারণ মানুষ। তবুও আন্দোলন থেকে পিছু হঠেননি ইলিয়াস প্রেমিকরা। ২৩ এপ্রিল রণক্ষেত্রে পরিণত হয় বিশ্বনাথ উপজেলা সদর। সারা দেশে আতঙ্কের জনপদ হিসেবে পরিচিতি পায় এই উপজেলা। সেদিন ইলিয়াস আলীর সন্ধান দাবীতে আন্দোলন করতে গিয়ে ত্রি-মুখী সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান জাকির, মনোয়ার ও সেলিম নামের তিন ইলিয়াস সমর্থক। সবমিলিয়ে ইলিয়াস ‘নিখোঁজ’ ইস্যুতে সারাদেশে প্রাণ হারান আট জন। আহত হন বেশ কিছু মানুষ। কিন্তু একে একে নিখোঁজের সাত বছর পূর্ণ হলেও আজ পর্যন্ত ইলিয়াসের কোন সন্ধান দিতে পারেনি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এপরও নিখোঁজ বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস’র জন্য অন্তহীন অপেক্ষা চলছে সিলেট বিএনপির।

সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমান মারা যাওয়ার পর এম ইলিয়াস আলী হয়ে উঠেন সিলেট বিএনপির একমাত্র কান্ডারী। শুধু সিলেট নয়, গোটা বিভাগের একজন অভিভাবক হিসেবে তিনি নেতৃত্ব দেন। সিলেট বিভাগ বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হলেও রাজধানী ঢাকায় সকল আন্দোলন সংগ্রামে তিনি ছিলেন অগ্রসৈনিক। তাঁর ঝাঝালো বক্তব্যে নেতাকর্মীরা উজ্জিবীত হতেন। নিখোঁজের ৫ দিন পূর্বে সিলেটের ঐতিহাসিক কোর্টপয়েন্টে সরকার বিরোধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন ইলিয়াস আলী। সিলেটে এটিই ছিল তাঁর সর্বশেষ সমাবেশের বক্তব্য। নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্যে দেয়া সেই ঐতিহাসিক বক্তব্যটির ভিডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। ইলিয়াস আলী বা তার গাড়িচালক আনসার আলী কোথায় আছেন ? তাঁরা আদৌ বেঁচে আছেন কিনা, এসব প্রশ্নœই বিএনপিদলীয় নেতাকর্মীদের মনে। ইলিয়াসের নিখোঁজ নিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্তি আছে।

কেউ কেউ মনে করেন, ইলিয়াস আলীকে চিরতরে গুম করে দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিবেশী একটি রাষ্ট্রের ভূমিকা থাকার বিষয়টিও সামনে আনেন তারা। অপরপক্ষে, নেতাকর্মীদের অনেকেরই ধারণা, ইলিয়াস আলীকে শুধু দৃশ্যপট থেকে আড়াল করে রাখা হয়েছে। কোনো এক সময় তাকে ছেড়ে দেওয়া হতে পারে। ইলিয়াসের পরিবার মনে করেন তিনি ফিরে আসবেনই। আজ হোক কাল হোক ইলিয়াস আসবেন। বিভিন্ন সভা সমাবেশে ইলিয়াসপতœী তাহসিনা রুশদীর লুনা বলে থাকেন “ আপনারা আন্দোলন চালিয়ে যান, আন্দোলন সংগ্রাম করেই আপনাদের ইলিয়াস আলীকে ফিরিয়ে আনতে হবে”। অবশ্য ইতিমধ্যে বিএনপির নেতৃত্বে চলে আসছেন লুনা। গেল সংসদ নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ও হয়েছিলেন। যদি ও আইণি জঠিলতায় তার মনোনয়ন ঠিকেনি। এছাড়া সকল উপজেল ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে মাঠ চষে বেড়িয়েছেন লুনা। বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের সকল সভা সমাবেশে বক্তব্য দিয়েছেন তিনি। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ লুনাকে নেতৃত্বে নিয়ে আসতে সবাইকে নির্দেশনা দিয়েছে অনেক আগেই। আলাপকালে সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ বলেন, আমরা বিশ্বাস করি ইলিয়াস আলী বেঁচে আছেন। আমরা মনে করি সরকারই তাকে গুম করেছে। তাদের কাছেই আছেন ইলিয়াস আলী। সাত বছর পেরিয়ে গেলেও ইলিয়াস আলীর জন্য বিএনপির নেতাকর্মীদের অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়নি। তিনি ফিরবেন, আগের মতোই দলের হাল ধরবেন। মানুষের পাশে দাঁড়াবেন। সেইসাথে তাঁর পদচারণায় মুখরিত হয়ে ওঠবে নির্জীব হয়ে পড়া তাঁর বৈঠকখানা, হাসি ফুটবে তাঁর মায়ের মুখে, জেগে ওঠবে সিলেট বিএনপি। এমন মন্তব্য আলী আহমদের। তিনি বলেন, একজন নাগরিকের ব্যাপারে যদি পরিবার পরিজন, রাজনৈতিক সহকর্মী অভিযোগ করে তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, তবে সরকারের দায়িত্ব ওই ব্যক্তিকে খুঁজে বের করা। কিন্তু ইলিয়াস আলীর ক্ষেত্রে সরকার নির্লিপ্ত। এতে প্রমান হয়, ইলিয়াস সরকারের কাছেই আছেন। আর সরকার ইলিয়াস আলীকে ফিরিয়ে না দিলে চরম মাশুল দিতে হবে। তবে সবার চেয়ে ইলিয়াস আলীর মায়ের অপেক্ষার যেন অন্ত নেই। ইলিয়াস নেই এমনটি মানতে নারাজ তাঁর মা সূর্যবান বিবি। ইলিয়াস আলী আছেন এবং ফিরে আসবেন এমন প্রত্যাশা এই মায়ের।

বিশনাথের খাজাঞ্চি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিএনপি নেতা গিয়াস উদ্দিন তালুকদার ইলিয়াস আলীর মায়ের এমন অনুভুতির কথা জানান।  এ ইউপি চেয়ারম্যান বলেন, আমরা প্রতিনিয়ত ইলিয়াস ভাইর পরিবারের নিকট যাই। উনার মায়ের সাথে বসে কথা বলি। আমরা দেখি সন্তানের জন্য মায়ের আকুতি কতটুকু। তিনি এখনো বিশ্বাস করেন তার সন্তান অবশ্যই ফিরে আসবেন। ইলিয়াস পরিবারের ঘণিষ্টজন সাবেক বিশ্বনাথ উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ন আহ্বায়ক খালেদ আহমদ বলেন, বিশ্বনাথের মানুষ এখনো জননেতা এম ইলিয়াস আলীর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় রয়েছেন। আমাদের নেতা ফিরে আসবেনই। আজো মানুষ চোখের জল ফেলে এ নেতার জন্য অপেক্ষায় আছেন। এদিকে সিলেটে বিএনপির পক্ষ থেকে নিখোঁজের পর থেকে ব্যাপক আন্দোলন-বিক্ষোভ শুরু হলেও এখন আর ইলিয়াস কি নিয়ে সিরিয়াস দলীয় কর্মসূচি দেখা যায়না। নিখোঁজ দিবসে মিলাদ ও দোয়া মাহফিলেই সীমাবদ্ধ রয়েছে এ সকল কর্মসূচি। এ ব্যাপারে সিলেট জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক এডভোকেট ফখরুল হক বলেন, সিলেট বিএনপির প্রাণপুরুষ ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার পর উত্তাল হয়ে ওঠেছিল সারাদেশ। দফায় দফায় হরতাল পালন করেছিল বিএনপি। ছিল বিক্ষোভ মিছিল, প্রতিবাদ সমাবেশ, দোয়া মাহফিল, মিলাদ মাহফিল, মানববন্ধনসহ নানান কর্মসূচী। সেই ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর ১৭ এপ্রিল আমরা নানা কর্মসূচী দিয়ে থাকি। এবার ও তিনদিনব্যাপী কর্মসূচী গ্রহন করেছে সিলেট বিএনপি। এদিকে বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক, সিলেট জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য এম. ইলিয়াস আলীর গুম হওয়ার ৭ বছর অতিবাহিত হওয়ায় তাকে ফিরে পাওয়ার দাবিতে সিলেট জেলা বিএনপি ৩ দিন ব্যাপী কর্মসূচী ঘোষণা করেছে। ঘোষিত কর্মসূচী অনুযায়ী আগামী আজ বুধবার বাদ আছর হযরত শাহজালাল (রহ.) দরগাহ মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল এবং ১৮ এপ্রিল বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় সিলেটের জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকার বরাবরে ইলিয়াস আলী সহ গুম হওয়া নেতৃকর্মীদের ফেরত পাওয়ার দাবিতে স্মারকলিপি প্রদান করা হবে। এছাড়া আগামী ২৯ এপ্রিল সোমবার বিকেল ৩টায় নগরীর মিরের ময়দানস্থ লা-রোজ হোটেলের কনফারেন্স হলে জননেতা এম. ইলিয়াস আলী, ছাত্রনেতা ইফতেখার আহমদ দিনার, জুনেদ আহমদ ও আনসার আলীকে ফিরে পাওয়ার দাবিতে ‘গুমের অপরাজনীতি ও বর্তমান বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হবে। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এছাড়া উপস্থিত থাকবেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ।

সিলেট জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুল কাহির চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ সিলেটবাসীর প্রিয়নেতা জাতীয় রাজনীতির অহংকার জননেতা এম. ইলিয়াস আলী সহ গুম হওয়া সকল নেতাকর্মীদের অক্ষত ফেরত দাবি করেন এবং জেলা বিএনপি ঘোষিত ৩ দিনব্যাপী কর্মসুচী সমূহে বিএনপি এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের সকল নেতাকর্মীকে যথাসময়ে উপস্থিত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। সোমবার গণমাধ্যমে প্রেরিত প্রেসবিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন সিলেট জেলা বিএনপির সহ দফতর সম্পাদক দিদার ইবনে তাহের লস্কর।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *







© All rights reserved © 2017 Nonditosylhet24.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ