শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ০৮:২১ পূর্বাহ্ন

সিলেটের পাথর রাজ্যের দুই ওসির বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ

সিলেটের পাথর রাজ্যের দুই ওসির বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ

নিউজটি শেয়ার করুন

নন্দিত ডেস্ক :  পাথরখেকোদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা দেয়ার বিস্তর অভিযোগ উঠেছে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি শফিকুর রহমান খান ও গোয়াইনঘাট থানার ওসি দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে। সচেতন মহলের পক্ষ থেকে স্থানীয় দুদক অফিস, পুলিশের শীর্ষ মহলে ওই দুই ওসির বিরুদ্ধে দুর্নীতির একাধিক অভিযোগ করার পরও কোনো প্রতিকার নেই। পুলিশ কর্মকর্তাদের নীরব ভূমিকায় পাথরখেকোদের কবলে পড়ে স্থানীয় গ্রামবাসীর অনেকেই তাদের ভিটেমাটি হারিয়ে পথে বসেছে। কথামতো ভিটে না ছাড়ায় মিথ্যা মামলা দিয়ে গ্রেফতার করে কারাগারে নিক্ষেপের অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।

স্থানীয় কয়েকজন আ’লীগ নেতা ও মুক্তিযোদ্ধা সম্প্রতি দুই ওসিকে ‘কুতুব’ হিসেবে আখ্যায়িত করে জেলা ও পুলিশ প্রশাসন, দুদকের কাছে একাধিক লিখিত অভিযোগ করেন। কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসির বিরুদ্ধে করা অভিযোগে বলা হয়েছে, ওসি শফিকুর রহমান রেঞ্জ ও জেলা পুলিশের শীর্ষ দুই কর্মকর্তাকে বড় অংকের উৎকোচ দিয়ে কোম্পানীগঞ্জে পোস্টিং নিয়েছে। সেখানে যোগ দেয়ার পরই পাথর উত্তোলনে পরিবেশ বিধ্বংসী সহস্রাধিক বোমা মেশিন ব্যবহারের সুযোগ করে দিয়ে তিনি কোটি কোটি টাকা বানিয়েছেন।

বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের ২৬ ফেব্র“য়ারি সুপ্রিমকোর্ট পাথর কোয়ারিতে বোমা মেশিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করে রায় দেয়। সরকারও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এর পরও সহস্রাধিক বোমা মেশিন পাথর উত্তোলনে ব্যবহৃত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, দিনে প্রতিটি বোমা মেশিন থেকে ওসি শফিকুর আদায় করছেন ২০ হাজার টাকা করে। বিপুল অংকের এই অর্থের ভাগবাটোয়ারা হচ্ছে শীর্ষ কর্তাব্যক্তিদের মধ্যেও।

এ ব্যাপারে বর্তমানে ঢাকায় বদলি হওয়া দুদকের সিলেট অফিসের এক শীর্ষ কর্মকর্তা এসব অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি  বলেছে, গত মার্চ মাসে তাদের বিরুদ্ধে তদন্তে নামে দুদক। তবে আমি বদলি হয়ে আসায় তদন্তের সবশেষ অবস্থা সম্পর্কে আমি অবহিত নই।

সিলেটের ডিআইজি কামরুল আহসান অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে  বলেছেন, অনেক অভিযোগের তদন্তও হয়েছে। আরও অভিযোগ উঠলে আরও তদন্ত হবে। তবে অভিযোগ থাকতেই পারে, তদন্তে সত্যতা পেলে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে দায়ীদের। তবে আর্থিক সুবিধা নিয়ে ওসি পোস্টিং দেয়ার অভিযোগ সত্য নয়।

আদালত ও মন্ত্রণালয়ের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ঝুঁকিপূর্ণ পন্থায় পাথর উত্তোলনের ফলে একের পর এক শ্রমিক নিহতের ঘটনা ঘটছে সিলেটের পাথর রাজ্যে। পরিবেশবাদীদের হিসাব অনুযায়ী দু’মাসে পাথরের গর্তে চাপা পড়ে নিহত হয়েছেন ৪৭ জন পাথর শ্রমিক। এসব হত্যার ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে পাথরখেকো ও পুলিশের বিরুদ্ধে। এ নিয়েও অভিযোগের শেষ নেই। নির্বিচারে পাথর উত্তোলনের সুযোগ দেয়ায় হুমকির মুখে পড়েছে কোম্পানীগঞ্জের ধলাই সেতুটিও।

অভিযোগের জবাবে কোম্পানীগঞ্জের ওসি শফিকুর রহমান খান বলেন, বোমা মেশিনের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখার কারণেই নামে-বেনামে এমন অভিযোগ করা হচ্ছে। কয়েকটি অভিযোগ তদন্তও হয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে অভিযোগকারীই সঠিক নয়। কে বা কারা জাল স্বাক্ষর করে মিথ্যা অভিযোগ পাঠিয়েছে। তিনি বলেন, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন।

পাথরখেকো সিন্ডিকেটের অন্যতম হয়ে ওঠার অভিযোগ ওসি দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধেও। তার প্রশ্রয়ে বেপরোয়া পাথরখেকোরাও। পাথরখেকোদের থাবায় দিশেহারা গোয়াইনঘাটের নিরীহ লোকজন। পরিকল্পিতভাবে নিরীহ লোকদের মামলায় ফাঁসিয়ে হয়রানি ও বাড়ি-ভিটে থেকে উচ্ছেদ করে পাথর লুটপাটের সুযোগ করে দেয়ার অভিযোগ ওসি দেলোয়ারের বিরুদ্ধে।

পাথরখেকো আর পুলিশের হুমকি, হয়রানিতে বাড়ি-ঘর থেকে চলতি মাসে উচ্ছেদ হওয়া গোয়াইনঘাটের ভুক্তভোগী নজরুল ইসলাম  জানান, উপজেলার নয়াবস্তি পশ্চিম এলাকায় তার বাড়ি ছিল। পাথরখেকোরা আমার জায়গা জোর করে দখলে নিতে প্রথম আমাকে সাদা কাগজে স্বাক্ষর দিতে বলে। রাজি না হওয়ায় হত্যা মামলায় আমাকে জেল পাঠানো হয়। পরে বাড়ি ছেড়ে দেয়ার শর্তে আমাকে মুক্তি দেয়া হয়। এর পরও আমাকে হুমকি দেয়া হয়। আমার বাড়িটি এখন পাথরখেকোদের দখলে। সপরিপারে গোয়াইনঘাট ত্যাগ করা নিঃস্ব নজরুল এখন কুমিল্লার হোমনা বসবাস করছেন। অভিযোগ রয়েছে ওসি দেলোয়ারের সহযোগিতায় পাথরখেকোরা গ্রাস করে নিয়েছে জহির মিয়া, মিজান মিয়া, জুলহাস মিয়া, দেলোয়ার হোসেন, সোহেল মিয়া, আবদুল মালেকের জমিজমাও। রাজত্ব কায়েম ও ধরে রাখার জন্য পাথরখেকোদের বিশাল বাহিনী গোয়াইনঘাটে সক্রিয়। নিরীহদের উচ্ছেদ করে ভূমির দখল নেয়াই তাদের প্রধান কাজ। পাথরখেকোদের সহযোগী হিসেবে সক্রিয় রয়েছেন এলাকার রহমত আলী, জামাল মিয়া, সজিব মিয়া ও সেলিম মিয়াসহ আরও অনেকেই। অভিযোগের জবাবে ওসি দেলোয়ার হোসেন বলেন, বাড়ি-ভিটে থেকে উচ্ছেদের ব্যাপারে নজরুল আইনের আশ্রয় নেননি। তিনি বিচারপ্রার্থী হলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হতো। অন্য অভিযোগগুলোর কোনো সত্যতা নেই। তিনি বলেন, পাথর ব্যবসায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির কারণেই আমার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠছে। কথা হয় সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের জেলা সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, পাথর রাজ্যের অরাজকতা বন্ধে সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রশাসনের দায়িত্বশীল ও জনপ্রতিনিধিদের সম্পদের হিসাব নেয়া জরুরি। তাদের ব্যক্তিগত ও আত্মীয়স্বজনের সম্পদের হিসাব নিলে তারা লুটপাটের অপকর্ম থেকে কিছুটা বিরত হতে পারেন। পাথর রাজ্যের অরাজকতা বন্ধে সরকারের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। তিনি বলেন, কোটি কোটি টাকার ঘুষ দিয়ে পাথর কোয়ারি সংশ্লিষ্ট থানায় পোস্টিং নেন কর্মকর্তারা। পোস্টিং হলে পরে বদলির আদেশ হলেও তারা যেতে চান না।

সিলেটের পুলিশ সুপার মো. মনিরুজ্জামান বলেন, কোনো অভিযোগ থাকলে অবশ্যই তদন্ত হবে। ওসিদের পোস্টিং দেয়ার কাজ পুলিশ সুপারের নয়। তাই আর্থিক সুবিধা নিয়ে পোস্টিং দেয়ার অভিযোগ মিথ্যা। গোয়াইনঘাটের নজরুলকে বাড়ি-ভিটে থেকে উচ্ছেদের বিষয়টি খতিয়ে দেখে সত্যতা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে জানান পুলিশ সুপার।

মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও সুবিধা নেয়ার অভিযোগ রয়েছে কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসির বিরুদ্ধে। ২০১৭ সালের ৩১ নভেম্বর রাতে কোম্পানীগঞ্জের সীমান্তবর্তী পারুয়া বাজারে কুখ্যাত ইয়াবা ব্যবসায়ী রাসাকে আটক করে পরে ছেড়ে দেয়ার লিখিত অভিযোগ জেলা পুলিশের কাছে রয়েছে।

তথ্যসূত্র : যুগান্তর

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *







© All rights reserved © 2017 Nonditosylhet24.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ