শনিবার, ২৪ অগাস্ট ২০১৯, ০৬:৩৬ পূর্বাহ্ন

সিলেটে ভেজাল বিরোধী অভিযানেও রুখা যাচ্ছে না নিষিদ্ধ পণ্য

সিলেটে ভেজাল বিরোধী অভিযানেও রুখা যাচ্ছে না নিষিদ্ধ পণ্য

নিউজটি শেয়ার করুন

নিজস্ব প্রতিবেদক :সিলেট নগরীতে ভেজালের বিরুদ্ধ প্রতিনিয়ত জেলা প্রশাসনের ২/১টি ভ্রাম্যমান আদালত নগরীতে অভিযান চালাচ্ছে।জরিমানা করছে। পঁচা-ভাসি খাবার ধ্বংস করছে। মেয়াদােত্তীর্ণ পণ্য আগুনে পুড়ানো হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের এই কার্যক্রম নগরবাসীর প্রশংসা কুড়াচ্ছে।

তবে নিষিদ্ধ পণ্যে বাজার এখনো সয়লাভ। এর বিরুদ্ধে অ্যাকশনে যাওয়ার কোন পরিকল্পনা নেই।

নিষেধ হওয়ার পর এতদিন পর গতকাল বুধবার নগরীতে একটি অভিযান পরিচালনা হয়েছে মাত্র।

শুধু তাই নয়, জেলা প্রশাসনের বাজার মনিটরিং টিমের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে এখনো বাজার তদারকি করতে না পারা। সুষ্ঠুভাবে বাজার তদারকি হলে নিষিদ্ধ পণ্য বিক্রি হয়ে যেতো। সচেতন নগরবাসীর ধারণা এমনটাই।
এসিআই লবণ, সান চিপস ও বাঘাবাড়ী ঘি। মানহীন প্রমাণিত ৫০টি পণ্যের অন্তর্ভূক্ত এ তিনটি পণ্য। যা বাজারে বিক্রি নিষিদ্ধ। মানহীন এসব খাদ্যপণ্য দ্রুত বাজার থেকে সরিয়ে ধ্বংস করতে উচ্চ আদালতের রায়ও রয়েছে। যদিও আদালত কর্তৃক নিষিদ্ধ হওয়ার পর এসিআই লবণসহ দুটি পণ্যের উপর থেকে মঙ্গলবার নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় বিএসটিআই। অন্য ৫০টি খাদ্যপণ্য এখনো নিষিদ্ধ রয়েছে। কিন্তু নগরীসহ সিলেটের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিষিদ্ধ এসব খাদ্যপণ্য প্রকাশ্যেই বিক্রি চলছে। আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে এসব পণ্য বিক্রয়, বিপনন অব্যাহত রেখেছেন ব্যবসায়ীরাও। ফলে প্রশাসনের চলমান ‘ভেজাল’ বিরোধী অভিযানেও রুখতে পারছে না এসব পণ্য বিক্রি। যদিও ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে এসব নিষিদ্ধ খাদ্যপণ্য জব্দ হচ্ছে। জরিমানা আদায় করা হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। এ পর্যন্ত সর্বশেষ বুধবার নগরীর আম্বরখানায় পরিচালিত জেলা প্রশাসনের ভ্রাম্যমাণ আদালত বিপুল পরিমাণ এসিআই লবণ, সান চিপস ও বাঘাবাড়ী ঘি জব্ধ করে। যা পরবর্তীতে ধ্বংসও করা হয়।

বুধবার বন্দরবাজার, জিন্দাবাজারসহ নগরীর বিভিন্ন বাজার ও অলিগলির দোকানগুলোতে বিএসটিআইর মান পরীক্ষায় ভেজাল প্রমাণিত হওয়া ৫০ পণ্যের মধ্যে বেশিরভাগই বিক্রি হতে দেখা গেছে। দোকানিরা জানিয়েছেন, কোম্পানিগুলোর পরিবেশকরা আগের মতোই দোকানে এসে মাল দিয়ে যাচ্ছে। আর ক্রেতারা না জেনে ওই পণ্য কিনছেনও। তবে, ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ বলছেন, বিক্রয়ের জন্য দোকানে থাকা এসব পণ্য নিষিদ্ধ হওয়া বিষয়টি অবহিত নন। এসব কোম্পানিগুলোর পরিবেশকরাও পণ্যগুলো ফেরত নেওয়াতো দূরের কথা এ সম্পর্কে তাদেরকে এ বিষয়ে কিছু বলেওনি।

বিভিন্ন দোকান ঘুরে দেখা গেছে, বিএসটিআইর পরীক্ষায় মানহীন পণ্যগুলো প্রতিটি দোকানে থরে থরে সাজানো রয়েছে। এসিআইর লবণ, সিটি গ্র“পের তীর সরিষার তেল, বাংলাদেশ এডিবল অয়েলের রূপচাঁদা সরিষার তেল, মেঘনা ও প্রাণ গ্র“পের হলুদের গুঁড়া, বাঘাবাড়ী স্পেশাল ঘি সাজানো রয়েছে। এসব পণ্য ফেরত নিতে কোম্পানিগুলোর তরফ থেকে কেউ যোগাযোগ করছে কি না- জানতে চাইলে মিরাবাজারের এক
ব্যবসায়ী বলেন, পণ্য ফেরত নেওয়ার কথা কেউ বলেনি। উল্টো কোম্পানির ডিলাররা পণ্য দিয়ে যাচ্ছে। ক্রেতারাও কিনছেন। এসব পণ্য যে মানহীন, ক্রেতাদের বেশিরভাগই তা জানেন না।
শিবগঞ্জের এক মুদি দোকানি জানান, তার দোকানে এসিআইয়ের লবণ, রূপচাঁদা ও তীর ব্র্যান্ডের সরিষার তেল রয়েছে, তা আগের কেনা। এসব পণ্য নিষিদ্ধ হওয়ার বিষয়টি তিনি জানেন না বলেও জানান।
সচেতন মহল বলছেন, ভোক্তাদের মাঝে এ নিয়ে ব্যাপকভাবে সচেতনতা তৈরি না হওয়ায় নিষিদ্ধ এসব পণ্য ক্রয়-বিক্রয় অব্যাহত রয়েছে।

আদালত নিষিদ্ধ ঘোষিত ৫০ পণ্য এখনও বাজারে-এমন প্রশ্নের বিষয়ে জানতে চাইলে ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জাহাঙ্গির আলম বলেন, প্রতিদিনই অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ইতোমধ্যে বালাগঞ্জ, গাছবাড়ি, চৌমুহনীসহ আরো কয়েকটি উপজেলায় অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এর মধ্যে সিলেটের বিশ্বনাথে একটি দোকান থেকে নিষিদ্ধ ঘোষিত কোম্পানীর ৫ কেজি লবণ উদ্ধার করা হয়েছে। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মূলত এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা
সচেতন থাকলে ভেজাল পণ্য প্রতিরোধ করা বেশি কার্যকর হবে।

জেলা কর আইনজীবী সমিতির সভাপতি এডভোকেট আবুল ফজল বলেন, ‘আসলে নিষিদ্ধ ঘোষিত পণ্যগুলো নতুনভাবে দোকানে উঠছেনা। মালগুলো ব্যবসায়ীদের পুরনো স্টক হিসেবে এখনও শোভা পাচ্ছে।’ তবে, অভিযান বিস্তৃত হলে হয়তোবা এমন সমস্যা দ্রুত সমাধান সম্ভব। তিনি এ বিষয়ে আরো একটি তথ্য দিয়ে বলেন, যে কোম্পানীর লবণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সুযোগ বুঝে নিষিদ্ধ না হওয়া কোম্পানীগুলো এখন বাড়িয়ে দিয়েছে লবনের দাম। এ বিষয়টিও খোঁজ নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান তিনি।

সিলেট জেলা ব্যবসায়ী ঐক্যকল্যাণ পরিষদ’র সভাপতি চেয়ারম্যান শেখ মকন মিয়া বলেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত পণ্যগুলো বাজারে অবাধে বিক্রি হওয়া-ভালো সমাজের লক্ষণ নয়। এর মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা আদালতের রায়কে উপেক্ষা করলেন, বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। তিনি বলেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতসহ আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। তিনি বলেন, এ বিষয়ে ভোক্তাদের মধ্যেও সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। সর্বোপরি ক্রেতা-বিক্রেতার সমন্বিত প্রয়াসের মাধ্যমে ঝুঁকিমুক্ত পণ্য গ্রহণের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্যের অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
অভিযান কঠোর হলে দোকানগুলোতে নিষিদ্ধ ঘোষিত পণ্যগুলো থাকার সুযোগ থাকতো না- এমন মন্তব্য করে এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সিলেট জেলা বারের আইনজীবী এডভোকেট মোহাম্মদ মনির উদ্দিন। তিনি বলেন, অভিযান নামকাওয়াস্তে না হলে, দোকানদাররা খোদ নগরীতে এসব ভেজাল পণ্য বিক্রী করে কিভাবে ? তিনি বলেন, এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের কঠোর আইনী প্রযোগ এবং চিরুনী অভিযানই ভোক্তাদের নিরাপদ খাদ্য অধিকারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারে।

এই বিষয়ে জানতে সিলেটের জেলা প্রশাসক কাজী এমদাদুল ইসলামের সাথে সেলফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় মন্তব্য আদায় করা সম্ভব হয়নি।
উল্লেখ্য, বাজারে থাকা ২৭ ধরনের ৪০৬টি খাদ্যপণ্যের নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৩১৩টি পণ্যের পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, ৫২টি নিম্নমানের ও সেগুলোয় ভেজাল রয়েছে। সংবাদমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর এসব খাদ্যপণ্য বাজার থেকে জব্দ, প্রত্যাহার ও এর মানের উন্নয়ন না হওয়া পর্যন্ত উৎপাদন বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে ৮ মে ভোক্তা অধিকার সংগঠন ‘কনশাস কনজ্যুমার সোসাইটি’র (সিসিএস) পক্ষে হাইকোর্টে ওই রিট আবেদনটি করেন আইনজীবী শিহাবউদ্দিন খান। রবিবার হাইকোর্টের বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের বেঞ্চ ১০ দিনের মধ্যে মানহীন ৫২ পণ্য বাজার থেকে সরিয়ে ধ্বংস করার আদেশ দিয়ে বলে, মানপরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়া পর্যন্ত উৎপাদন বন্ধ রাখতে হবে।
মানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ না হওয়ায় ৫২টি খাদ্যপণ্যে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার মাস না পেরোতেই দুটি পণ্যের উপর থেকে মঙ্গলবার নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত মানসংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস টেস্টিং ইন্সটিটিউট (বিএসটিআই)।

এ বিষয়ে বিএসটিআইয়ের উপ-পরিচালক রিয়াজুল হক বলেন, ৫২টি ব্র্যান্ডের মধ্যে ৯টির লাইসেন্স বাতিল এবং বাকি ৪৭টির স্থগিত রাখা হয়েছিল। যাদের মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল তারা ইতোমধ্যেই নিজেদের সংশোধনের প্রচেষ্টা শুরু করেছে। এই পরীক্ষায় এসিআই ব্র্যান্ডের লবণ ও নিউজি ল্যান্ড ডেইরির ডুডল নুডুলস উত্তীর্ণ হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *







© All rights reserved © 2017 Nonditosylhet24.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ