সোমবার, ১৯ অগাস্ট ২০১৯, ১১:৩৭ পূর্বাহ্ন

সিলেট সিটিতে গ্রেফতার আতঙ্কে বিএনপি

সিলেট সিটিতে গ্রেফতার আতঙ্কে বিএনপি

নিউজটি শেয়ার করুন

নন্দিত সিলেট : সিলেট সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে গ্রেফতার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ দলটির স্থানীয় নেতাদের। তাদের মতে, প্রায় প্রতিদিনই নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন ধানের শীষের কর্মীরা। নির্বাচনী প্রচারে থাকা দলটির নেতাকর্মীদের দিনের বেলায় চিহ্নিত করে রাতে তাদের বাসাবাড়িতে হানা দিচ্ছে পুলিশ। এ ছাড়া পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি দেখানোসহ টেলিফোনে নির্বাচনী কাজ থেকে বিরত থাকতে হুমকি-ধমকি দেয়া হচ্ছে।

তাদের আরও অভিযোগ- নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে নতুন নতুন মামলা দিয়ে সক্রিয় নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করা

হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণায় নামতে ভয় পাচ্ছেন কর্মীরা। কেউ কেউ প্রচারে নামলেও পুলিশ দেখলে দ্রুত সটকে পড়ছেন। গ্রেফতার এড়াতে অনেকে নিজ বাসায় না ফিরে অন্যত্র রাত কাটাচ্ছেন।

তবে বিএনপির এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন  আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তারা বলছেন, পুলিশের পক্ষ থেকে হয়রানিমূলক কোনো পদক্ষেপই নেয়া হচ্ছে না। তাছাড়া রাজনৈতিক দল বিবেচনায় কোনো অভিযান চালাচ্ছে না পুলিশ। যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা রয়েছে।

সিলেট  বিএনপির মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী অভিযোগ করেন, নির্বাচনে তার বিজয় ঠেকাতে প্রতিপক্ষ নানা অপকৌশলের আশ্রয় নিচ্ছে। তার নেতাকর্মীদের নামে বিশেষ করে নির্বাচনের কাজে মূল ভূমিকা রাখা ব্যক্তিদের নামে মামলা দেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পুরনো পেন্ডিং মামলাও ব্যবহার করা হচ্ছে। কিছু অতি উৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তা নিজেদের অতিমাত্রায় আওয়ামী লীগের অনুগত প্রমাণের চেষ্টায় নেমেছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

জানা গেছে, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর ধানের শীষ প্রার্থীর অন্তত ১৫ জন নেতাকর্মী এখন পর্যন্ত গ্রেফতার হয়েছেন। এর মধ্যে বিএনপির মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর মিডিয়া সেলের প্রধান জুরেজ আবদুল্লাহ ছাড়াও আছেন সিলেট জেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট সাঈদ আহমদ, ছাত্রদলের সাবেক জেলা যুগ্ম সম্পাদক আসাদুজ্জামান, ছাত্রদলের সাবেক জেলার নেতা এনামুল হক, নুরুল ইসলাম, বিএনপির ৭ নম্বর ওয়ার্ডের নেতা লিয়াকত হোসেন, রাসেল ও সুমন। বিএনপি প্রার্থীর নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সম্পাদক আবদুর রাজ্জাককে ধরতে তার বাসায় অভিযান চালায় পুলিশ। তাকে না পেয়ে তার ব্যবসায়ী ছেলে রুমান রাজ্জাককে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় পুলিশ।

বিএনপির অভিযোগ- তফসিল ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৩টি মামলা করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৬ জুন ছাত্রদলের দেড় শতাধিক নেতাকর্মীর নামে একটি মামলা হয়। নির্বাচন সামনে রেখে নীলনকশার অংশ হিসেবে ওই মামলাটি করা হয়েছিল। কেননা খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে ২৩ জুন বিকালে ছাত্রদল কাজীরবাজার এলাকায় মিছিলের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। অনুমতি না থাকার অজুহাতে পুলিশ তাতে বাধা দেয়। তখন পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ হয়। কিন্তু সেই ঘটনার তিন দিন পর মামলা করা হয়। ছাত্রদলের নেতা বা কর্মী না হওয়া সত্ত্বেও ওই মামলায়ই গ্রেফতার করা হয়েছে বিএনপির মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর সার্বক্ষণিক সঙ্গী ও মিডিয়া সেলের প্রধান জুরেজ আবদুল্লাহকে। মূলত নির্বাচনী কাজে বিএনপি প্রার্থীকে পঙ্গু করে দিতেই পরিকল্পিতভাবে এ গ্রেফতার দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ দলটির স্থানীয় নেতাদের।

অপর দুটি মামলার মধ্যে একটির বাদী খোদ পুলিশ। অপরটির বাদী একজন আওয়ামী লীগ নেতা। এর মধ্যে নেতাকর্মীদের ছাড়িয়ে আনতে উপ-পুলিশ কমিশনারের (দক্ষিণ) কার্যালয়ের সামনে বিএনপির অবস্থানকে কেন্দ্র করে মামলায় ৩৯ জনের নামোল্লেখ ছাড়াও অজ্ঞাত পরিচয় ৫০-৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর আগে নির্বাচনী এলাকার বাইরে টুলটিকর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের একটি কার্যালয়ে আগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় ২২ জুলাই রাত পৌনে ১২টায় নগরীর শাহপরান থানায় ৩৪ জনের নামোল্লেখ করে অজ্ঞাত পরিচয় আরও ৩০-৩৫ জনকে আসামি করা হয়েছে।

এ ব্যাপারে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি ও সিলেট আইন কলেজের সাবেক ভিপি মাহবুবুল হক চৌধুরী  বলেন, মামলার জালে ফেলে গ্রেফতার, বাসায় বাসায় হানা দিয়ে নেতাকর্মীদের খোঁজা হচ্ছে। সাদা পোশাকের পুলিশ অনেকের বাসাবাড়িতে গিয়ে ধানের শীষের নির্বাচনী কাজে না নামতে পরিবারের সদস্যদের হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছে। এমনকি টেলিফোনে অনেককে গ্রেফতারের হুমকি দেয়া হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, পুলিশের এমন তৎপরতার কারণেই আমরা ইতিমধ্যে দুটি মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়ে এসেছি। ওই দুই মামলার মধ্যে পুলিশের কাজে বাধাদান সংক্রান্ত মামলার নামীয় ৩৯ জন ও আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে আগুনের মামলায় নামীয় ৩৪ জন পকেটে জামিননামা নিয়ে ঘুরছি। তারপরও নেতাকর্মীরা গ্রেফতার থেকে বাঁচতে পারবেন কিনা সেই আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, কেননা ‘অজ্ঞাত আসামি’ হাতিয়ারটা ব্যবহার করে যখন-তখন যে কাউকে গ্রেফতার করতে পারে। এ কারণে গত কয়েকদিন ধরে আমাদের নেতাকর্মীরা নির্বাচনী অফিসমুখী হচ্ছেন না। প্রার্থীদের সঙ্গে আমরা প্রচারে নামলেও গ্রেফতার আতঙ্কেই থাকতে হচ্ছে।

স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধি পরিবেশকর্মী হাসান মুর্শেদ বলেন, ঐতিহ্যগতভাবে সিলেটের সম্প্রীতির রাজনীতি সারা দেশে দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। কিন্তু সিটি নির্বাচন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কিছু অতি উৎসাহী সদস্য আমাদের সেই ঐতিহ্য নষ্টে ভূমিকা রাখছেন। সামান্য ঘটনায় একটি দলের মেয়র প্রার্থীর নেতাকর্মীদের নামে মামলা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে নৌকা প্রতীকের মেয়র প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরান  বলেন, ব্যক্তিগতভাবে আমি প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। তাহলে তিনি (আরিফ) সিলেটে সর্বশেষ মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারতেন না। আমার পোস্টার ছিঁড়ে ফেলে ধানের শীষের পোস্টার লাগানো হয়েছে। আমার নির্বাচনী অফিস পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সেই অফিস আমি বন্ধ করে দিয়েছি। তারপরও বিভিন্ন সময়ে আরিফের কর্মী ধরার পর আমি পুলিশকে বলে ছাড়িয়ে এনেছি। মামলা, গ্রেফতার ও হয়রানি প্রসঙ্গে বিএনপির অভিযোগ সম্পর্কে মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার আবদুল ওয়াহাব বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে দৈনন্দিন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে গ্রেফতার অভিযান চালানো হচ্ছে। গ্রেফতারকৃতদের আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। সুনির্দিষ্ট ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মামলা হয়েছে। অনেকের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ও বহু পুরনো মামলা আছে। নির্বাচনী ইস্যুতে পুলিশের পক্ষ থেকে অযথা কারও বাসাবাড়িতে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে না। বিএনপির পক্ষ থেকে পুলিশের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়। যদি এসব নিয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ থাকে, তাহলে তারা নির্বাচনী আইনকানুন অনুযায়ী যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করতে পারেন।

জানতে চাইলে রিটার্নিং কর্মকর্তা মো. আলীমুজ্জামান  বলেন, কোনো অভিযোগ পেলেই তা তদন্তের জন্য মহানগর পুলিশকে বলা হয়। তবে পুলিশ যদি তাদের চোখে কোনো অপরাধ দেখে, তাহলে সে অনুযায়ী তারা ব্যবস্থা নিতে পারে। সে কারণে মামলা দায়ের করতে পারে। এমনকি যে কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধেও তারা মামলা করতে পারে। সেটার সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই।

নিউজটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *







© All rights reserved © 2017 Nonditosylhet24.com
পোর্টাল বাস্তবায়নে : বিডি আইটি ফ্যাক্টরী লিঃ